গরুভোজ নিয়ে বিতর্ক
পশু জবাই না করার নির্দেশনা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে

গরুর মাংস-খিচুড়ি ভোজের একটি আয়োজন করেছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। সেই আয়োজন মন্দিরের সামনে করায় তা নিয়ে ওঠে বিতর্ক। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে সব ধরনের পশু জবাই না করার নির্দেশনা দিয়েছে। তার প্রতিক্রিয়ায় একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে গরু জবাইয়ের কর্মসূচি দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে প্রশাসনকে। এসব সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে উত্তেজনা।
ঘটনার শুরু হয় গত সোমবার। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা গরুর মাংস ও খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন সেদিন রাতে।
তারপর নানা বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার ক্যাম্পাসে পশু জবাই না করার নির্দেশনা আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
প্রক্টর অধ্যাপক আজম খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অমান্য করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
প্রশাসনের এ নির্দেশনা আসার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে। কেউ এর বিরোধিতা করছেন, কেউ করছেন সমর্থন।
এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থীদের পরিচালিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘জবিয়ান্স’র পক্ষ থেকে গরুভোজ আয়োজনের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘বিরানব্বই ভাগ মুসলিমের দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই নিষিদ্ধ করে উপাচার্য কাকে খুশি করতে চান?’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফ শাহিন এক ফেসবুক পোস্টে ক্যাম্পাসে গরু জবাইয়ের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে লেখেন, ‘দেখব কে বাধা দিতে আসে। সিটি করপোরেশন পারলে ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে প্রবেশ কইরেন।’
জকসুর এজিএস মাসুদ রানা আগামী শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জুমার নামাজের পর ক্যাম্পাসে গরুভোজ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চললেও ঘোষিত আয়োজনটি কীভাবে হবে এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিতর্কের শুরু যেভাবে
গত সোমবার রাতে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের সামনে যেখানে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন, তার পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় মন্দির।
তাই এই আয়োজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে আপত্তি তোলেন এক হিন্দু শিক্ষার্থী। তাকেও কেউ কেউ সমর্থন জানান। আবার অভিযোগ ওঠে, মন্দিরের সামনে রাখা নির্মাণকাজের জন্য রাখা ইট খুলে নিয়ে চুলা বানিয়ে সেই রান্না করা হয়েছিল। তবে ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
এসব নিয়ে পাল্টপাল্টি নানা অভিযোগের মধ্যে এই কথাও আসে যে এই আয়োজনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংশ্লিষ্টতা ছিল। তবে সংগঠনটি তা অস্বীকার করে বিবৃতি দেয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলতে থাকে। এক পক্ষ মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্নার আয়োজনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শামিল হিসেবে দেখছেন। অন্য পক্ষ বলছে, ছোট পরিসরের ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময়ে বারবিকিউ পার্টিসহ নানা ধরনের আয়োজন হয়ে থাকে। এর সঙ্গে ধর্মকে অবমাননার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
এসবের মধ্যে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, শিক্ষাজীবনের শেষ সময়টুকু স্মরণীয় করে রাখতে তারা মুক্তমঞ্চের সামনে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা থাকলেও সন্ধ্যায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার সিদ্ধান্ত নেন। প্রক্টর অফিসের মৌখিক অনুমতি নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের সামনে রান্নার প্রস্তুতি শুরু করেন। সেখানে পড়ে থাকা কিছু অব্যবহৃত ইট দিয়ে চুলা তৈরি করেন।
এই শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সনাতন ধর্মাবলম্বী কয়েকজন শিক্ষার্থী আপত্তি জানালে তারা ওই স্থান থেকে সরে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সামনে রান্নার আয়োজন করেন। দ্বিতীয় স্থানে রান্নার প্রস্তুতি নেওয়ার পর তাদের জানানো হয়, ব্যবহৃত ইটগুলো পাশের মন্দিরের এবং সেগুলো ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আপত্তি রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ইটগুলো মন্দিরের বলে জানার পর সেগুলো সরিয়ে রাখা হয়। পরে ক্যাফেটেরিয়া থেকে আনা লোহার চুলায় রান্না শেষ করেন তারা।
আয়োজক শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তাদের আয়োজনের সঙ্গে কোনো ধর্ম অবমাননা, ধর্মীয় স্থাপনার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন কিংবা কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্য ছিল না।




