দেশের বীমা শিল্পের স্থপতি এম এ সামাদ

ভাষাসৈনিক, লেখক ও দেশের প্রথম বেসরকারি নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯২৩
মৃত্যু: ১৭ অক্টোবর ২০০৫
অনন্যকীর্তি: দেশের প্রথম শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘মিনার’-এর সার্বিক ব্যবস্থাপক (১৯৪৯)।
পথ পরিক্রমা
১৯৪৫
‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু।
১৯৪৮
উর্দুর প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তানের ইস্তফা প্রদান।
১৯৫১
প্রুডেনশিয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে বীমা পেশায় প্রবেশ।
১৯৭৩
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় বীমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা।
১৯৭৭
জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিযুক্ত।
১৯৮৫
‘বাংলাদেশ জেনারেল ইনসিওরেন্স কোম্পানি’ (বিজিআইসি) প্রতিষ্ঠা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় আর্থিক অবকাঠামো এবং বিশেষ করে আধুনিক বীমা শিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে কজন ক্ষণজন্মা ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে অবস্থান করছেন মোহাম্মদ আজিজুস সামাদ, যিনি এম এ সামাদ নামেই সমধিক পরিচিত। পেশাগত শৃঙ্খলা, অদম্য সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দূরদর্শী চিন্তাভাবনার সমন্বয়ে গঠিত তার পুরো জীবনটি শুধু একজন সফল বীমাবিদের গল্প নয়; বরং তা বিংশ শতাব্দীর এক নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক ও সংস্কৃতিবান মানুষের দৃষ্টান্ত।
১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন এম এ সামাদ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার কর্মজীবনের প্রথম ভাগটি গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক তথ্য ও সংবাদ সম্প্রচারের গতিশীল পরিসরে। ভারত ভাগের আগে তিনি দিল্লির অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাংলা সংবাদের অন্যতম প্রধান সম্পাদক ও বার্তা পরিবেশক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়টিতে ভারতীয় মহাদেশীয় চিন্তাজগতের অন্যতম প্রখ্যাত পণ্ডিত নীরদ সি চৌধুরীর সান্নিধ্য লাভ করা তার চিন্তাধারার ব্যাপ্তি সমৃদ্ধ করেছিল। দেশভাগের পর রেডিও পাকিস্তানে কর্মরত থাকাকালে তিনি যখন দেখলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করছে, তখন তিনি নিজের নিরাপদ চাকরি বা পেশাগত সুবিধার পরোয়া করেননি।
১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে সূচিত ভাষা অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি, যার চরম পরিণতিতে তৎকালীন রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে তাকে রেডিও পাকিস্তানের চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। চাকরি হারানোর পর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে তিনি ও তার স্ত্রী ফৌজিয়া বেগম ১৯৪৯ সালে শিশু-কিশোরদের জন্য ‘মিনার’ নামে একটি ব্যতিক্রমী ও রুচিশীল বাংলা সাময়িকী প্রকাশ করেন। সাময়িকীটিকে কেন্দ্র করে ড. মোস্তফা নুরুল ইসলাম, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, এনায়েত উল্লাহ খান ও রাবেয়া খাতুনের মতো প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীরা এক ছাতার নিচে সমবেত হয়েছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে।
তরুণ আজিজুস সামাদ ১৯৫১ সালে প্রুডেনশিয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্সে চাকরিতে যোগদানের মাধ্যমে বীমা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এর পর আরও কয়েকটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন এম এ সামাদ। এর মধ্যে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয়কৃত ব্যাংকিং ও বীমা খাতকে পুনর্গঠনে সরকারের যে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, সেখানে তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার অভাবনীয় সুফল পায় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অনন্য দক্ষতার পরিচয় দেন এবং এই খাতটির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে নিরলস কাজ করে যান। শুধু তাই নয়, দেশে বীমা খাতে দক্ষ জনবল তৈরির অপরিহার্যতা উপলব্ধি করে তিনি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন, যা আজ পর্যন্ত এই সেক্টরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি সুরমা লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনের শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেও নিজের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার প্রমাণ রাখেন।
সরকারি দীর্ঘ চাকরিজীবনের সমাপ্তি টানার পর সামাদের মনে এক নতুন এবং বৈপ্লবিক চিন্তার উদয় ঘটে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু সরকারি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে স্বাধীন বাংলাদেশের বিশাল অর্থনীতির বীমা চাহিদার শতভাগ পূরণ সম্ভব নয়; অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনতে হলে আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি নন-লাইফ বীমা খাত গড়ে তোলা আবশ্যক। এই চিন্তাকে বাস্তব রূপ দিতে ১৯৮৫ সালে তিনি গঠন করেন ‘বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’, যা বিজিআইসি (BGIC) নামে সমধিক পরিচিতি পায়। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে প্রথমবারের মতো নন-লাইফ বীমা ব্যবস্থার শুভ সূচনা করেন।
তার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও আপসহীন নীতিবোধের কারণে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের বেসরকারি বীমা খাতের ওপর জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তাকে বীমা ব্যবসায় আসার অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি দেশের বীমা মালিকদের শীর্ষ ফোরাম ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে একাধিকবার এই শিল্পের সার্বিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণ করেন এবং পুঁজিবাজারের সার্বিক কাঠামোর প্রসারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
একদিকে বীমা খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও দূরদর্শী সংগঠক, অন্যদিকে সমাজমনস্ক সাহিত্যিক— এ দুই সত্তার বিরল মেলবন্ধন ঘটেছিল তার চরিত্রে। ব্যবসায়ী বা প্রশাসক হলেও লেখালেখি থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি তিনি। লাইফ ও নন-লাইফ বীমা পরিচালনার ব্যবহারিক নিয়মাবলি ও নীতিমালার ওপর রচিত তার চারটি মৌলিক গ্রন্থ আজকেও বাংলাদেশে বীমা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রামাণ্য পাঠ্যবই হিসেবে সম্মানিত। এর বাইরেও তার রচিত ‘শনিবারের ছুটি’ শীর্ষক ছোটগল্প সংকলনটি তদানীন্তন বাংলা কথাসাহিত্যে তার নান্দনিক ও সংবেদনশীল রুচির সুস্পষ্ট স্বাক্ষর হিসেবে সুধীসমাজ কর্তৃক বহুল প্রশংসিত হয়েছিল।
২০০৫ সালের ১৭ অক্টোবরে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার দেওয়া দিকনির্দেশনা এবং নীতিগত সততা এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। সব মিলিয়ে এম এ সামাদ শুধু একটি নাম নন; বরং তিনি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান; যিনি সততা, প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থিক ও বীমা খাতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে গিয়েছেন।




