হারানো ঐতিহ্যের সংগ্রহশালা

কাঠের পালকি, ঢেঁকি, জাঁতা, হারিকেন কিংবা সাদা-কালো টেলিভিশন— এগুলো একসময় গ্রাম-বাংলার মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে, কিছু টিকে আছে শুধু মানুষের স্মৃতিতে। হারিয়ে যেতে বসা সেসব উপকরণ, উপকূলের মানুষের জীবনযাপন ও ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবন মিউজিয়াম। এখানে এক ছাদের নিচে স্থান পেয়েছে এক হাজারের বেশি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন।
উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব ধানখালী গ্রামে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রেরণার উদ্যোগে ২০২৫ সালে গড়ে তোলা হয় এই সংগ্রহশালাটি। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনধারা ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। উপকূলের মানুষের লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতির পরিচয়ও তুলে ধরা হয়েছে এখানে। বনবিবির কাহিনির বিভিন্ন চরিত্রের সাদা ভাস্কর্য সেই ঐতিহ্যেরই অংশ।
কাঠের তৈরি মূল প্রদর্শনীকক্ষে রয়েছে সুন্দরবনের বিভিন্ন উদ্ভিদের নমুনা। সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া ও গরানের মতো ম্যানগ্রোভ প্রজাতির পাশাপাশি সংরক্ষিত আছে সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীর জোয়ার-ভাটার পানির নমুনা। কাচের বোতলে রাখা এসব পানির নমুনার সঙ্গে রয়েছে শতাধিক দেশীয় শাকসবজির বীজ। প্রকৃতি ও পরিবেশের নিদর্শনের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রায় প্রযুক্তি এবং উপকরণের পরিবর্তনের চিত্রও ফুটে উঠেছে সংগ্রহশালায়। একসময় ঘরে ঘরে ব্যবহৃত ক্যাসেট প্লেয়ার, রেডিও, ক্যামেরা, সাদা-কালো টেলিভিশন, হারিকেন, লোহার ট্রাংক ও খড়মের মতো সামগ্রী এখন নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত। কৃষিকাজ ও মাছ ধরার নানা উপকরণও এখানে রাখা হয়েছে।
সংগ্রহশালার কর্মী বৃষ্টি মণ্ডল জানালেন, এখানে রাখা একটি সাদা-কালো টেলিভিশনের কাঠের ফ্রেম ও পেছনের কাঠামো নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন শ্যামনগরের হরিণগর এলাকার এক ব্যক্তি। এমন অনেক নিদর্শন স্থানীয় মানুষের কারিগরি দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।
সুন্দরবন মিউজিয়ামে শুধু গৃহস্থালি ও কৃষিকাজের উপকরণই নয়, সংরক্ষিত হচ্ছে এলাকার ইতিহাসের নানা দলিলও। রয়েছে শ্যামনগরের ঐতিহাসিক নকিপুর জমিদারবাড়ির স্থাপত্যের নকশা ও পুরনো স্থাপনার কিছু অংশ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা, ডাকটিকিট, চিঠিপত্র, পোস্টার, পঞ্জিকা ও পুরনো দলিল স্থান পেয়েছে এখানে।
সংগ্রহশালার উদ্যোক্তা শম্পা গোস্বামীর ভাষায়, একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতি হারিয়ে গেলে সেই ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। উপকূলের নতুন প্রজন্ম যেন তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংগ্রহশালায় এক হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে।



