শিবচর
তরুণদের ‘চায়ের কুঠির’

ছবি: আগামীর সময়
দুই পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি। পানিতে ফুটে আছে শাপলা, ছড়িয়ে আছে নানা জলজ উদ্ভিদ। মাঝেমধ্যে ঝাঁক বেঁধে নামে অতিথি পাখি। চারপাশের নীরব গ্রামীণ পরিবেশে বিকেল নামলেই জমে ওঠে মানুষের কোলাহল। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে চায়ের অপেক্ষা করেন দর্শনার্থীরা। কেউ চা পান করছেন, কেউ পোড়া পাউরুটি খাচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত ছবি ও ভিডিও ধারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে ওঠা মাদারীপুরের শিবচরের ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ ক্রোকচর বাওর ব্রিজের ‘চায়ের কুঠির’ এখন পরিণত হয়েছে স্থানীয়দের অন্যতম আকর্ষণীয় আড্ডাস্থলে।
টিকটক, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চায়ের কুঠির’র ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। চায়ের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে ছবি তোলা ও রিলস বানানোতেই যেন তাদের আগ্রহ বেশি।
স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে মাত্র এক মাস আগে যাত্রা শুরু করা এই চায়ের দোকানে এখন প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার চা ও রুটি।
উদ্যোক্তাদের দাবি, গত এক মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকার চা বিক্রি হয়েছে। সামনে শীত মৌসুমে এই আকর্ষণ আরও বাড়াতে আশপাশের বিস্তীর্ণ জমিতে সূর্যমুখী চাষের পরিকল্পনা করছেন তারা। উদ্যোক্তাদের আশা, সূর্যমুখীর হলুদ সৌন্দর্য যোগ হলে জায়গাটি সারা বছর দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে।
স্থানীয় কয়েকজন তরুণের নিয়মিত আড্ডার জায়গা ছিল দক্ষিণ ক্রোকচর বাওর ব্রিজ। প্রতিদিন বিকেলে সালাহউদ্দিন, জসিম, রহমান, দীন ইসলাম, রাহাত ও শাকিলসহ কয়েকজন বন্ধু সেখানে বসে গল্প করতেন। ব্রিজের দুই পাশে বিশাল জলাশয়। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর থাকে এলাকা, আবার শীত এলে পানি শুকিয়ে সেখানে নানা ধরনের ফসল চাষ হয়।
ইউটিউবে নির্জন গ্রামীণ পরিবেশে চায়ের দোকানের একটি ভিডিও দেখে নিজেদের আড্ডার জায়গাতেও এমন একটি দোকান করার পরিকল্পনা করেন তারা। এরপর নিজেরাই দোকান তৈরির কাজে নেমে পড়েন। ‘চায়ের কুঠির’ নামে একটি দোকান এবং পাশাপাশি আরও দুটি ছোট দোকান তৈরি করেন তারা। দোকান তৈরির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতে থাকেন।
গত ৬ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ‘চায়ের কুঠির’। শুরুতে মেনুতে ছিল রং চা, দুধ চা, মালাই চা ও পোড়া পাউরুটি। উদ্বোধনের পর থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের আগ্রহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দোকানটি হয়ে ওঠে ভাইরাল।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিকেল গড়াতেই বাওর ব্রিজ এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তরুণ-তরুণীদের অনেকেই দলবেঁধে এসে চা পান করার পাশাপাশি ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন।
চায়ের দোকানে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি। কেউ অপেক্ষা করছেন এক কাপ মালাই চায়ের জন্য, কেউ আবার পোড়া পাউরুটি ও চায়ের স্বাদ নিতে ব্যস্ত। পাশাপাশি রয়েছে চটপটি ও ফুচকার দোকান। দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য রাখা হয়েছে দোলনাও।
তবে অনেক দর্শনার্থীর কাছে চায়ের চেয়েও বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে জায়গাটির প্রাকৃতিক পরিবেশ। দুই পাশের জলাশয়, শাপলা, জলজ উদ্ভিদ, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন রকম আবহ।
‘চায়ের কুঠির’র উদ্যোক্তা মো. দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতাম। আমরা সবাই পড়াশোনা করি। বিকেল হলেই বাড়ির পাশের এই ব্রিজে বসে সময় কাটাতাম। একসময় মনে হলো এখানে একটি চায়ের দোকান দেওয়া যেতে পারে। ইউটিউবে এমন একটি জায়গায় চায়ের দোকানের ভিডিও দেখে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করি। এরপর নিজেরাই দোকান তৈরির কাজে নেমে পড়ি।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। দোকানের বয়স মাত্র এক মাস। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। এর মধ্যেই প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার চা বিক্রি করছি।’
উদ্যোক্তাদের আরেকজন মো. সালাহউদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমরা নিজেরাও চিন্তা করতে পারিনি এতটা সাড়া পাব। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার চা-রুটি বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি দুধের চা বিক্রি হয়। আমরা দুটি দোকান দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন এখানে পাঁচটি দোকান হয়েছে।
শরীয়তপুরের মো. জাকির মিয়া টিকটকের মাধ্যমে ‘চায়ের কুঠির’র কথা জানতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমি সৌদি প্রবাসী। টিকটকের মাধ্যমে এই চায়ের দোকানের খোঁজ পাই। বাড়িতে আসার পর এখানে চলে আসলাম। চায়ের স্বাদও খুব ভালো। তবে সবচেয়ে ভালো লাগে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে এমন পরিবেশে সময় কাটানো এবং চা পান করতে বেশ ভালো লাগছে।’
তরুণী সোনিয়া আক্তার বলেন, চায়ের দোকানটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। চা খেতে এসে অনেকেই ভিডিও করছে, ছবি তুলছে। এখানকার মালাই চা আর পোড়া রুটির স্বাদ ভালো।
আরেক দর্শনার্থী সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘আধা ঘণ্টা ধরে চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। প্রচুর ভিড়। দোকানে সব সময় লম্বা সিরিয়াল থাকে।’
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর এখন ‘চায়ের কুঠির’ নিয়ে বড় পরিকল্পনা করছেন উদ্যোক্তারা। তারা চান, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল ট্রেন্ডের ওপর নির্ভর না করে জায়গাটিকে সারা বছরের জন্য দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে।
দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই এখনও লেখাপড়া করছি। বিকেলে অবসর সময়ে চায়ের দোকান করি। বেকার বসে থাকার চেয়ে ভালো কোনো আইডিয়া নিয়ে শুরু করলে সফল হওয়া সম্ভব—আমরা সেটিই দেখাতে চাই।’
তিনি বলেন, আশপাশের পানি শুকিয়ে গেলে এখানকার জমিতে সূর্যমুখী চাষ করব। এরই মধ্যে জমি লিজ নিয়েছি। শীত মৌসুমে চারপাশে সূর্যমুখী ফুল ফুটলে এখানকার পরিবেশ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। তখন মানুষ শুধু চা খেতে নয়, সূর্যমুখীর সৌন্দর্য উপভোগ করতেও এখানে আসবে।
দক্ষিণ ক্রোকচর বাওর ব্রিজ মূলত দুই গ্রামের যোগাযোগের একটি পাকা সড়কের অংশ। সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্ষায় এসব মাঠ পানিতে ডুবে গিয়ে বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়। শীতকালে পানি শুকিয়ে গেলে সেখানে বরিশস্যসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়।
বর্ষায় জলমগ্ন প্রকৃতি আর শীতে সবুজ-সোনালি ফসলের মাঠ ঋতুভেদে বদলে যায় এলাকার রূপ। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগ যুক্ত হওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার এই চায়ের দোকানটি এখন পরিচিতি পাচ্ছে জেলার বাইরেও।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সামনে আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। চায়ের কুঠিরের আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি করতে চান তারা। তাদের লক্ষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ছোট্ট চায়ের দোকান যেন সাময়িক আলোচনার বিষয় হয়ে থেমে না যায়; বরং প্রকৃতি, চা আর তরুণদের উদ্যোগে এটি হয়ে উঠুক সারা বছরের একটি জনপ্রিয় গ্রামীণ বিনোদনকেন্দ্র।



