রাজারহাট
ডাকঘরেরই নেই স্থায়ী ঠিকানা

নীলেরকুটি ডাকঘরের ভবন না থাকায় ইডিডিএ আবু হানিফের বাড়িতে চলছে ডাকঘর
যে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় একসময় গ্রামের মানুষ প্রহর গুনতেন, তার হাতের একটি চিঠিই কখনো বদলে দিত পরিবারের আনন্দ-বেদনার হিসাব। সেই ডাকসেবারই এখন স্থায়ী ঠিকানা নেই কুড়িগ্রামের রাজারহাটে। কোথাও ঝড়ে ভেঙে গেছে ডাকঘর, কোথাও উড়ে গেছে চাল। নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় কোনো ডাকঘর চলছে কর্মীর বাড়িতে, কোনোটি ভাড়া করা ঘরে। অথচ একসময় এসব ডাকঘর থেকেই মানুষের হাতে পৌঁছানো হতো সরকারি চিঠি, ব্যাংকের নথি, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ও পার্সেল।
রাজারহাট উপজেলার নয়টি শাখা পোস্ট অফিসের একটিরও নিজস্ব ভবন নেই। নাজিমখান সাব পোস্ট অফিস চলছে ভাড়া করা কার্যালয়ে। আর নিজস্ব ভবন থাকলেও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে উপজেলা ডাকঘর। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে অবকাঠামোগত সংকটের মধ্যে চলছে সরকারি ডাকসেবা।
বৈদ্যের বাজার, মীরের বাড়ি, ঘড়িয়ালডাঙ্গা, রতিগ্রাম, সিঙ্গারডাবরীহাট, সিন্দুরমতি, ডাংরারহাট, নীলেরকুটি ও জোড়সয়রা—উপজেলার এই নয়টি শাখা পোস্ট অফিসের কোথাও নেই নিজস্ব ভবন। কোনোটি কর্মীর বসতঘরে, কোনোটি ভাড়া করা কক্ষে। প্রয়োজনীয় আসবাবের ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে করতে হচ্ছে কর্মীদের নিজেদের টাকায়।
ঝড়ে নীলেরকুটি ডাকঘরের ভবন ভেঙে যাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১২ বছর। নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় নিজের বাড়িতেই ডাকঘরের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নীলেরকুটি ডাকঘরের ইডিডিএ আবু হানিফ।
আবু হানিফ বলেছেন, শুরুতে তিন শতক জমি সরকারের নামে দেওয়া হয়েছিল। ঘরও করেছিলাম। ঝড়ে ঘর ভেঙে যাওয়ার পর আর করা হয়নি। ১২ বছর ধরে অফিস নাই, নিজেদের বাড়িতেই অফিস করে কাজ করি।
তিনি আরও জানান, চাকরির শুরুতে তার মাসিক বেতন ছিল ৩০০ টাকা। ধাপে ধাপে বেড়ে বর্তমানে তা প্রায় ৪ হাজার ৩৪০ টাকা হয়েছে।
জোড়সয়রা পোস্ট অফিসের অবস্থাও আলাদা নয়। সেখানে ইডিএ, ইডিডিএ ও ইডিএমসি পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন কর্মী। নিজস্ব ভবন না থাকায় সবাই মিলে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে ডাকসেবার কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা। প্রত্যেকে মাসে ১০০ টাকা করে মোট ৩০০ টাকা ভাড়া দেন। অফিসের প্রায় সাত হাজার টাকার আসবাবপত্র কিনেছেন নিজেদের অর্থে।
ডাংরারহাট পোস্ট অফিসের চিত্রও প্রায় একই। ইডিএ জোৎস্না আক্তার জানান, আগে বাজারে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে ডাকঘরের কার্যক্রম চালানো হতো। মাসে ৬০০ টাকা ভাড়াও দিতে হতো নিজেদের পকেট থেকে। প্রায় তিন বছর ধরে তার বাড়িতেই এখন চলছে পোস্ট অফিস। একই শাখায় তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন মো. পেয়ারুল ইসলাম ও লিয়াকত আলী।
জোৎস্না আক্তার বলেছেন, আগে সিমেন্টের দোকানের পাশে অফিস ছিল। প্রতিদিন ট্রাক আসা-যাওয়া করত। তাই বাড়িতে পোস্ট অফিস করেছি। পোস্ট অফিসের জন্য আমার শ্বশুর তিন শতাংশ জমি দিয়েছেন। কিন্তু অফিসের ভবনের জন্য কোনো বাজেট এখনো হয়নি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বদলেছে। চিঠির সোনালি অতীত হারিয়ে গেছে। এখন ডাকঘরে আসে শুধু ব্যাংক লোনের চিঠি।
ইডিডিএ মোজাফফর হোসেনের ভাষ্য, আগের মতো আর মানুষ চিঠি লিখে না। ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা কমেছে। তবে এখন ব্যাংক লোনের চিঠি খুব আসে।
রাজারহাট উপজেলা ডাকঘরে পোস্টমাস্টার সুরভী শারমিনসহ চারজন কর্মরত রয়েছেন। নাজিমখান সাব পোস্ট অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন পোস্টমাস্টার আনোয়ারুল ইসলাম ও একজন পোস্টম্যান।
শাখা পোস্ট অফিসগুলোর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা পোস্টমাস্টার সুরভী শারমিন বলেছেন, আমার দায়িত্ব শুধু হিসাব গ্রহণ করা। এর বাইরে শাখা অফিস সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘরের পোস্ট অফিস পরিদর্শক ও রাজারহাট উপজেলার শাখা পোস্ট অফিসের পরিদর্শক মোকলেছুর রহমান জানান, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের নখদর্পণে রয়েছে। কোনো অফিসের হাল কেমন, অফিসের জমি ও ভবন এসব বিষয়ে প্রতিবছর প্রতিবেদন নেয় তারা। এবছর দক্ষিণাঞ্চলে বাজেট হয়েছে। হয়তো পরবর্তী বছর উত্তরাঞ্চলে বাজেট আসবে। বাজেট আসলেই ভবনের কাজ শুরু করা হবে।
একসময় যে ডাকঘর ছিল গ্রামের মানুষের খবর পাওয়ার অন্যতম ভরসা, সেই ডাকঘরেরই এখন অনেক শাখার স্থায়ী ঠিকানা নেই। কর্মীদের ব্যক্তিগত বাড়ি আর ভাড়া করা ঘরে চলছে সরকারি সেবা। যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে, চিঠির সংখ্যা কমেছে; কিন্তু মানুষের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি নথি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এখনো রয়ে গেছে। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে রাজারহাটের ডাকঘরগুলো কবে পাবে নিজস্ব ঠিকানা, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন।




