নিমিষেই ঝরে যায় তরতাজা ১০ প্রাণ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ৯ দিনের মাথায় রংপুরে ঘটেছিল এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ৩ এপ্রিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভ্যানে করে রংপুর-সাতমাথা সড়কের দখিগঞ্জ শ্মশানে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল কয়েকজন স্বাধীনতাকামী মানুষকে। চোখ ও হাত বেঁধে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিল হায়েনার দল। তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল আশপাশের মানুষ। কারও কারও কানে বুট-বুলেট আর গুলির বিকট শব্দ পৌঁছালেও সাহস করে বের হয়নি কেউ। মুক্তিকামী ১১ বাঙালির রক্তে রক্তাক্ত হয়েছিল দখিগঞ্জ শ্মশান।
আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে দখিগঞ্জ শ্মশান বধ্যভূমি। বর্তমানে সেখানে শহীদদের নাম লেখা একটি স্মৃতিফলক রয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ।
রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ শশ্মান বধ্যভুমি দিবস স্মরণে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেলে আয়োজিত স্মরণ সভায় বক্তারা দখিগঞ্জ শশ্মান বধ্যভূমিসহ সকল বধ্যভূমি ও স্মৃতিস্তম্ভ-ভাস্কর্য রক্ষায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, একটি শোষণ-বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক সমাজের আকাঙ্খায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের সেই আকাঙ্খার বাস্তবায়ন ঘটেনি। তাই এদেশের মানুষ বৈষম্যহীন সমতার সমাজ বিনির্মাণের আকাঙ্খায় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। যা কোনো দেশপ্রেমিক বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না।
এ অবস্থায় সকলকে শোষণ, বৈষম্যহীন এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানানো হয়। আলোচনা শেষে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয়। দখিগঞ্জ শশ্মান বধ্যভূমি স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ এর সঞ্চালনায় সভায় বক্তৃতা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ হোসেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডা. মাফিজুল ইসলাম মান্টু, আমজাদ হোসেন সরকার, সাংবাদিক বাবলু নাগ, সমাজকর্মী ও সংগঠক আব্দুল জব্বার, মসিউর রহমান, দেবদাস ঘোষ দেবু, মাহফুজ আলম প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল রাতে এই স্থানটিতে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন ন্যাপের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওয়াই এ মাহফুজ আলী জররেজ, ক্ষীতিশ হালদার, এহসানুল হক দুলাল, রফিকুল ইসলাম রফিক, শান্তি চাকী, দুর্গাদাস অধিকারী, গোপাল চন্দ্র, তোফাজ্জল হোসেন মহরম, উত্তম কুমার অধিকারী গোপাল, পাগলা দরবেশ। গুলিবিদ্ধ একজন আরেকজনের ওপর ঢলে পড়েন। নিমিষেই ঝরে যায় তরতাজা ১০ প্রাণ। হায়েনার দলের এই হত্যাযজ্ঞে গুলিবিদ্ধ মানুষের স্তুপ থেকে প্রাণে বেঁচে যান একজন। তিনি ছিলেন তাজহাটের দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক (মন্টু ডাক্তার)। তার পায়ে গুলি লাগে। পরবর্তী সময়ে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। সকল বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর এই দিবসটি পালন করা হয়।

