নওগাঁর আত্রাই
টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ, ১২ বছর ধরে শিকলে বাঁধা বকুলের জীবন

শিকলে বাঁধা বকুল শাখিদারের জীবন
নওগাঁর আত্রাইয়ে বকুল শাখিদার (১৮) নামের এক তরুণের জীবন কাটছে শিকলে বাঁধা অবস্থায়। পরিবারের দাবি, মানসিক বিকাশজনিত সমস্যার কারণে প্রায় ১২ বছর ধরে তাকে বাড়ির পাশের একটি আমগাছের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হচ্ছে। দরিদ্রতার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে তার চিকিৎসা।
ছেলের এমন জীবন দেখে অসহায় হয়ে পড়েছেন মা-বাবা। সন্তানের উন্নত চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দিতে সবার সহযোগিতা চেয়েছে পরিবারটি।
বকুল উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বামনি গ্রামের দিনমজুর আতিকুল শাখিদারের ছেলে।
বকুলের মা ববিতা বিবি জানান, বকুল তার প্রথম সন্তান। প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দিলে নৌকাযোগে তাকে আত্রাই হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। পথেই নৌকার মধ্যে বকুলের জন্ম হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চলাফেরা ও আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। এরপর রাজশাহীতে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে প্রসবের সময় মাথায় চাপ লাগার কারণে এমন সমস্যা হয়েছে বলে জানানো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েক বছর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, ধারদেনা করে এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় তিন বছর বকুলের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু অর্থাভাবে পরে আর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুলের আচরণে পরিবর্তন আসে। ছয় বছর বয়সের পর থেকে সে বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করত এবং মানুষের সঙ্গে অসংগত আচরণ করত। কখনো কখনো লোকজনের মারধরের শিকারও হয়েছে সে।
ববিতা বিবির ভাষ্য, এসব পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন সকালে বাড়ির পাশের সড়কের ধারে একটি আমগাছের সঙ্গে বকুলকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। সেখানেই তাকে সকাল ও দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। রাতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয় বলে জানান তিনি। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই পায়ে শিকল পরিয়ে দিতে হয়, না হলে সে দৌড়ে চলে যায় বলে দাবি করেন তার মা।
ছেলের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে ববিতা বিবি বলেন, রোদ-বৃষ্টি, শীত—সবই আমার সন্তানের গায়ে লাগে। ঘরের ভেতর থেকে ছেলের এমন অবস্থা দেখতে হয়। বুকের কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারি না। আমি চাই, আমার সন্তান যেন চিকিৎসা পায় এবং শিকলমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পায়।
বকুলের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও নাজুক। বাড়িতে তাদের জমি বলতে মাত্র আড়াই শতক জায়গা রয়েছে। বকুলের বাবা অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। বকুলসহ তাদের তিন সন্তান। দিনমজুরির সামান্য আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হয় পরিবারটিকে। ফলে বকুলের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ববিতা বিবি জানান, ছেলের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তাদের নেই। তাই বকুলের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আবেদন পেলে খোঁজ-খবর নিয়ে চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হবে।



