রংপুরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী তৈরিতে ২২ বছর ধরে চিঠি চালাচালি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উন্নয়ন ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি রংপুর বিসিক শিল্পনগরীতে। ২৫টি শিল্পকারখানার মধ্যে ঋণ জটিলতায় তিনটি বন্ধ, রুগ্ণশিল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে চারটি। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় প্লট বরাদ্দের কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা শিল্পকারখানা গড়তে পারছেন না।
এ অবস্থায় ২২ বছর ধরে অনেকবার মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি হলেও রংপুরে ‘দ্বিতীয় শিল্পনগরী’ গড়তে থমকে আছে জমি অধিগ্রহণের কাজ। এতে করে বিভাগীয় নগরী রংপুরে পরিকল্পিতভাবে শিল্পের বিকাশ হচ্ছে না। হোঁচট খেতে হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের। তাদের দাবি, রংপুরে বিসিকের অধীনে ক্ষুদ্রশিল্প গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিসিক, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হলে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন শিল্পনগরী স্থাপনের প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
১৯৮০ সালে ২০ একর জায়গা নিয়ে রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকায় গড়ে ওঠে বিসিক শিল্পনগরী। এরপর তা উদ্যোক্তাদের ইজারা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্পনগরীটিতে তেমন কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। বেহাল সড়ক, ভাঙাচোরা ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপত্তার অভাব, অনুন্নত অবকাঠামোসহ নানা সংকট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানে ৮২টি প্লট আছে। প্রতিটি প্লটের আয়তন সর্বনিম্ন ৩ হাজার ১৫০ বর্গফুট থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার বর্গফুট। মোট ২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে চালু আছে ১৮টি। এ ছাড়া মামলা, ঋণখেলাপিসহ নানা কারণে তিনটি বন্ধ রয়েছে, রুগ্ণশিল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান। শিল্পোদ্যোক্তা বাড়লেও বাড়েনি প্লটের সংখ্যা। এমনকি শিল্পনগরী সম্প্রসারণে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগও আলোর মুখ দেখেনি।
বিসিক শিল্পনগরীতে থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাস সংযোগ থাকলে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পেত। অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ থাকে। নতুন শিল্পনগরী হলে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ সৃষ্টি হবে। রংপুরের ছোট-বড় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক ও বিসিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে নগরীর অদূরে দমদমা এবং ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসংলগ্ন রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনে প্রায় ৫০ একর জমি অধিগ্রহণে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করা হয়। কিন্তু সেই আবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।
সবশেষ ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য শিল্প পার্ক স্থাপনে রংপুর সদর উপজেলার রামনাথপুর ও হরিদেবপুর মৌজার ১০০ একর জমির সম্ভাব্য মূল্য, স্কেচ ম্যাপসহ প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই চিঠির উত্তর মেলেনি।
২০০৪ সাল থেকে রংপুরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়তে চিঠি চালাচালি হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ কারণে নতুন নতুন শিল্পোদ্যোক্তারা প্লট নিতে আগ্রহী হলেও তাদের প্লট দিতে পারছে না বিসিক কর্তৃপক্ষ।
উদ্যোক্তা রাকিবুল ইসলাম বললেন, ‘রংপুরে বিসিকের অধীনে ক্ষুদ্রশিল্প গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন শিল্পনগরী হলে নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ হবে। ছোট-বড় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।’ একই ধরনের কথা জানালেন শিল্পোদ্যোক্তা আবদুল মজিদ।
বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বিশেষ অবদান রাখায় পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তা সামসী আরা জামান কলির ভাষ্য, জায়গার অভাবে তিনি চামড়া ও পাটপণ্য উৎপাদনে কোনো কারখানা স্থাপন করতে পারছেন না। দ্রুত দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তুলে নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জমি বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে চেম্বার নেতাদের দাবি, বিসিকের দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপন কার্যক্রম সচল করা জরুরি।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদ হোসেন বললেন, বিসিক শিল্পনগরীতে জায়গা না থাকায় এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় প্রতিনিয়ত কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। তাই দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
রংপুর বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এহেছানুল হক বলেছেন, ‘দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরীর জমির জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে এটি ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। এটি বাস্তবায়নে আমাদের আশ্বস্ত করেছে মন্ত্রণালয়।’



