রাণীনগরে ৫৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনে ফাটল, ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান

ছবি: আগামীর সময়
নওগাঁর রাণীনগরে ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ৫৩টির ভবনের বিম ও দেয়ালে ফাটল ধরেছে। কোথাও কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় এক বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই পাঠদান চলছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক তাঁদের কোমলমতি সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতেও দ্বিধাবোধ করছেন।
উপজেলার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, এর মধ্যে ২৫টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার পিরেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাতাব হোসেন জানান, ১৯৮৬ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করা হয় বিদ্যালয়ের ভবন। নির্মাণের প্রায় ৩০ বছর পরই ভবনটির বেহাল দশা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর উপজেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। ভবনটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে তাঁরা চিঠি দেন। কিন্তু দীর্ঘ ১০ মাসেও নতুন ভবন কিংবা পাঠদানের বিকল্প ব্যবস্থা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই ভবনে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
উপজেলার ৩৮ নম্বর কসবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহফুজুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণিকক্ষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করে তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে টিনের ছাউনির একটি ঘরে পাঠদান করানো হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য একটি ভবনের কক্ষের দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই ওই কক্ষে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের বাবা মহসিন আলী বলেন, ‘সন্তানের মাথার ওপর ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। যেকোনো সময় পুরো ছাদ ভেঙে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ আশঙ্কায় বেশ কয়েক দিন সন্তানকে বিদ্যালয়ে যেতে দিইনি। পরে শিক্ষকদের অনুরোধে পাঠালেও সন্তান বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত চরম আতঙ্কে থাকতে হয়।’ শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের তালিকা অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে পিরেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরদার কয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়িয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভেবড়া কালীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভান্ডারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দামুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাতোয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সঞ্জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাসকামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নারায়ণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়সার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, করজগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লক্ষ্মীকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিম্বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাসপারইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কৃষ্ণপুর মালঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আনালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পালশাকৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঝগ্রাম মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাণীনগর (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ছয়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
রাণীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জোনাব আলী বলেন, ইতিমধ্যে ২৫টি বিদ্যালয়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য বিদ্যালয় পরিদর্শন করে নতুন করে তালিকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাকিবুল হাসান বলেন, বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ধরন অনুযায়ী ৫৫টি বিদ্যালয়ের তালিকা করা হয়েছে। তালিকার বাইরে থাকা বিদ্যালয়গুলোর বিষয়েও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, পিরেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। সেখানে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টিনের বেড়া দিয়ে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম রেজু বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানোন্নয়নে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



