সুন্দরবন ঘিরে ১৮ ইকো-রিসোর্ট, বন্ধের নির্দেশে অনিশ্চয়তায় অনেকের জীবিকা

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা ইউনিয়নে গড়ে ওঠা ১৮টি ইকো-রিসোর্টে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের। তবে পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় এসব রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন খাতের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২১ সাল থেকে দাকোপের নদীতীরবর্তী এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব ইকো-রিসোর্ট গড়ে উঠতে শুরু করে। রিসোর্টগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে চাকরি, নৌযান পরিচালনা, পর্যটক গাইড ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আগে জীবিকার জন্য যাদের সুন্দরবন থেকে সম্পদ আহরণ করতে হতো, তাদের কেউ কেউ এখন বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন। উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা পাঠশালা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডও স্থানীয় শিশুদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চায় ভূমিকা রাখছে।
ইকো-রিসোর্টের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় বাসিন্দা পলাশ মণ্ডল বললেন, ‘আমরা একসময় পুরোপুরি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। জীবিকার তাগিদে বনে যেতে হতো। কিন্তু গ্রামে ইকো-রিসোর্ট গড়ে ওঠায় এখন আমার ও আমার স্ত্রীর স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে। এখন আর বন থেকে সম্পদ আহরণ করতে হয় না। আমাদের মতো এলাকার অনেক মানুষ চাকরি ও ছোটখাটো ব্যবসা করে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন।’
তবে সম্প্রতি নদীতীরবর্তী প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ইকো-রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (রোয়াস) সভাপতি এবং ইরাবতী ইকো-রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমন ইসলাম বললেন, ইকো-রিসোর্টের মূল লক্ষ্য সুন্দরবন রক্ষা এবং পর্যটকদের কাছে এর সৌন্দর্য ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো নির্দেশনা থাকলে আইন ও পরিবেশবান্ধব নিয়ম মেনে তা সমাধানে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইমন ইসলাম আরও বললেন, সব রিসোর্ট বন্ধ না করে সুনির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব নির্দেশিকা মেনে পরিচালনার সুযোগ দিলে বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতি-দুটিই শক্তিশালী হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. ওয়াসিউল ইসলাম জানালেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বনের সুরক্ষা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। যুগোপযোগী ও কার্যকর পর্যটন নীতিমালা অনুসরণ করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখার পাশাপাশি বনাঞ্চল সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদ বললেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং অতি সংবেদনশীল বনাঞ্চলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিধি অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে নীতিমালা প্রণয়নের সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে স্থাপনা অপসারণ না করা হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



