সাত মাস ধরে বন্ধ ৩০ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ কাজ, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

ছবি: আগামীর সময়
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কালপুর পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের সেতুর কাজ প্রায় সাত মাস ধরে বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ বাড়ছে স্থানীয়দের। ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো বেইলি ব্রিজ দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করছে হাজারো মানুষ ও যানবাহন। ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি জনদুর্ভোগও বেড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় সাত মাস আগে নির্মাণকাজ বন্ধ করে ঠিকাদার চলে গেছেন। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও বর্ষার কারণে মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জটিলতা নিরসন হলে দ্রুত কাজ আবার শুরু হবে।
স্থানীয়রা জানান, সকাল ও সন্ধ্যায় সেতুর দুই পাশে প্রায় তিন ঘণ্টা করে মোট ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত যানজট থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী ও রোগীরা। ১৯৯৪ সালে কালপুর পাগলা নদীর ওপর পুরোনো বেইলি ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। কয়েক বছর ধরে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বাস ও ট্রাক চলাচল করতে পারে না। একমুখী ব্রিজ হওয়ায় পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। পাশ দিয়ে হাঁটার সময় ব্রিজ থেকে নদীতে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগ কমাতে পুরোনো বেইলি ব্রিজের পাশে ১৭২ দশমিক ৩০০ মিটার দীর্ঘ নতুন সেতু নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ১৪ নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে গত প্রায় সাত মাস ধরে দৃশ্যমানভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় হতাশ স্থানীয়রা। ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো বেইলি ব্রিজ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া শিবগঞ্জ থেকে মনাকষা পর্যন্ত সড়কটিও বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়কটি প্রশস্ত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই সড়ক দিয়ে প্রতি মিনিটে অন্তত ৪০টি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চলাচল করে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুকুল ইসলাম ও সোনার্দি বলেন, আমরা বহুদিন ধরে এই সেতুর অপেক্ষায় আছি। কিন্তু প্রায় সাত মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজ দিয়ে চলাচল করতে প্রতিদিন ভয় লাগে। আর ভারী যানবাহনকে অনেক দূর ঘুরে যেতে হয়। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ হলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে এবং এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসবে।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুল মান্নান বলেন, সেতুর নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ নয়। ভূমি অধিগ্রহণ ও কিছু আনুষঙ্গিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব কারণে মাঠপর্যায়ে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জটিলতা নিরসন হলেই পূর্ণোদ্যমে নির্মাণকাজ আবার শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, আটটি পরিবারকে উচ্ছেদ ও ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় কাজের গতি কমেছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলেই দ্রুত নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। গত ৯ সেপ্টেম্বর আমি বলেছি, উচ্ছেদকাজ শেষ হলেই ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে। এ বছরের নভেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন বলে টিকটকারদের প্রচার করা তথ্য সঠিক নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, খুব দ্রুত কাজ পুনরায় শুরু হবে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, শিবগঞ্জের স্থানীয় মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। উচ্ছেদ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই নির্মাণকাজ স্বাভাবিক গতিতে শুরু হবে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়কের জায়গায় বসবাসকারী আটটি পরিবারের সদস্যদের বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কথা বলেন। তারা জানান, উচ্ছেদ কার্যক্রম শেষ হলে সেতুর মধ্যভাগ ও সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা রয়েছে।
এদিকে সংযোগ সড়কের জায়গায় বসবাসকারী কমেলা, বায়েজিদ, রাজ্জাক ও রুস্তম বলেন, আমাদের অন্য কোথাও বাড়ি করার মতো জায়গা নেই। আমরা অনেক বছর আগে জায়গা কিনে এখানে বসবাস করছি। সরকার আমাদের ক্ষতিপূরণ দিলে আমরা সরে যাব।
প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুটি শেষ হলে শিবগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় গতি আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুটি চালু করা হবে।




