মাদারীপুরে অনুমোদন ছাড়াই চলছে ৯২% ক্লিনিক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাদারীপুরে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাইরে ঝকঝকে সাইনবোর্ড, চিকিৎসকদের নাম ও আধুনিক সেবার প্রতিশ্রুতি থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে সংশয়, কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আবার কোথাও লাইসেন্স বাতিলের পরও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় ১৭৭টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ১৪টির। সেই হিসাবে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ।
কোথাও লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা অস্পষ্ট, কোথাও নবায়ন নিয়ে জটিলতা, আবার কোথাও লাইসেন্স বাতিলের পরও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট জেনারেল হাসপাতাল। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করায় ২০২২ সালে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করে। এরপরও হাসপাতালটি চালু রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই উপজেলার পাঁচতলার মোড় এলাকার লাইফ কেয়ার ডিজিটাল ল্যাব ও হাসপাতালের কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দোতলার একটি টিনশেড ঘরে পরিচালিত হচ্ছে। বাইরে সাইনবোর্ডে বিভিন্ন চিকিৎসকের ছবি ও পরিচিতি ব্যবহার করা হলেও তারা নিয়মিত সেখানে রোগী দেখেন কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রোগী সংগ্রহ করে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর অভিযোগও করেছেন কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা। তাদের দাবি, চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে বলা হয়।
চিকিৎসা নিতে আসা সাবের ইসলামের ভাষায়, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গেলে অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার মনে হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন, সেখানে প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন রোগীরা। রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মালতি বাড়ৈ জানিয়েছেন, ‘পেটে ব্যথা নিয়ে গত সোমবার তিনি লাইফ কেয়ার ডিজিটাল ল্যাব ও হাসপাতালে যান। সেখানে তাকে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করতে বলা হয়।’
মালতি বাড়ৈর ভাষ্য, ‘আমার শুধু পেটে ব্যথা ছিল, কিন্তু তারা একের পর এক পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পরে সেখানে চিকিৎসা নিতে না চাইলে তারা বললেন, এখানে এলে চিকিৎসা নিতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ডে আমি আরও অসুস্থ বোধ করছিলাম।’
অবশ্য কিছু প্রতিষ্ঠান ৮ থেকে ৯ বছর আগে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেও পায়নি। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের কাগজপত্র সংগ্রহ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে আছে।
টেকেরহাট জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক শামীম হোসেনের দাবি, লাইসেন্স নবায়নের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। তার আশা, কয়েক দিনের মধ্যেই নবায়ন করা লাইসেন্স হাতে পাবেন।
তবে লাইসেন্সের আবেদন করা আর অনুমোদন পাওয়া এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকলে তার ভিত্তিতে অনির্দিষ্টকাল স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না। এক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আইনগত অবস্থান যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান ও তদারকির অভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের সুযোগ পাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক যোগসূত্র থাকার অভিযোগও উঠেছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সাধারণত রোগীরা সাইনবোর্ড, চিকিৎসকের পরিচিতি ও কর্মীদের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বৈধ কি না, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি যথাযথ কি না, কিংবা প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল রয়েছে কি না, তা যাচাই করা তাদের পক্ষে কঠিন। ফলে অনুমোদন ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ভুল রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে— মনে করেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শরীফুল আবেদীন কমলের ভাষ্য, লাইসেন্স ছাড়া ক্লিনিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন করেনি, তাদের দ্রুত নবায়ন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। অন্যথায় লাইসেন্স বাতিল করা হবে। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তারও।



