সাগরের ভাঙনে কূল হারাচ্ছে কক্সবাজারের সৈকত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্ণবৈষম্য, যুদ্ধ ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বিশ্বখ্যাত বক্সার মোহাম্মদ আলী ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্ত্রী ভেরোনিকাকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সময় একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন ছাত্রনেতা আখতার নেওয়াজ খান বাবুল কক্সবাজারের কলাতলী সমুদ্রসৈকতে তাকে এক বিঘা জমি দেওয়ার ঘোষণা দেন। সফরে মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশের নাগরিকত্বও পেয়েছিলেন। সেই জমি এখন আর নেই। তা বিলীন হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।
শুধু সেই জমিই নয়, গত ৩৫ বছরে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ক্ষয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৮২ একর ভূমি। কোথাও সাগর এগিয়ে আসছে, কোথাও ভেঙে পড়ছে সৈকত, আবার কোথাও পলি জমে জেগে উঠছে নতুন চর। ঢেউ, স্রোত, পলি, নদীপ্রবাহ, ভূপ্রকৃতি ও মানুষের নানা হস্তক্ষেপে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে কক্সবাজারের উপকূলের মানচিত্র।
দীর্ঘমেয়াদি স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও উপকূলের এ পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট। কক্সবাজার উপকূলের প্রায় ৮৫ কিলোমিটার অংশ নিয়ে ১৯৮০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করা এক গবেষণায়, হিমছড়িকে ক্ষয়ের গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উখিয়ার ইনানীকে বলা হয় অত্যন্ত ডায়নামিক এলাকা। সেখানে কোনো সময়ে পলি জমে সৈকত সমুদ্রের দিকে এগিয়েছে, আবার অন্য সময়ে ভাঙনে উপকূল স্থলভাগের দিকে সরে গেছে।
আরও সাম্প্রতিক চিত্র পাওয়া যায় ২০২৫ সালে এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায়। ১৯৯০-২০২০ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পূর্ব উপকূলের ১ হাজার ৪৭৯টি ট্রান্সেক্ট (ভৌগোলিক রেখা) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫৮ দশমিক ১৪ শতাংশে ক্ষয়ের প্রবণতা ছিল। তবে ক্ষয়ের তুলনায় ভূমি অগ্রসর হওয়ার দূরত্ব বেশি হওয়ায় পুরো গবেষণা এলাকায় নতুন ভূমি সৃষ্টির প্রবণতাও ছিল। সেই নতুন ভূমি তৈরির বড় অংশ হয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে।
কক্সবাজার সদর, রামু ও উখিয়ার চিত্র আবার একমুখী নয়। কক্সবাজার সদরে ১৯৯০-২০০০ সালে ক্ষয়ের বিপরীতে ভূমি সঞ্চয় বেশি ছিল। ২০০০-২০১০ সালেও সঞ্চয় ছিল বেশি। কিন্তু ২০১০-২০২০ সালে ক্ষয় বেড়ে ৮৫ দশমিক ৩৫ মিটারে পৌঁছে, যেখানে সঞ্চয় ছিল ৫৭ দশমিক ৮৫ মিটার। রামুতে ২০০০-২০১০ সালে ভূমি সঞ্চয় বেড়ে ১৮৪ দশমিক ৮১ মিটার হলেও পরের দশকে ক্ষয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৮ দশমিক ৯১ মিটার।
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভূতাত্ত্বিক ওশানোগ্রাফি বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার মো. জাকারিয়ার মতে, সমুদ্রের এই বদলে যাওয়া সীমানা মোকাবিলায় পুরো ১৪৫ কিলোমিটার উপকূলে একই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, হিমছড়ি, ইনানী, কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের ভূ-প্রাকৃতিক আচরণ আলাদা। উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ও রাডার তথ্যের পাশাপাশি ড্রোন, সৈকতের প্রোফাইল, ঢেউয়ের উচ্চতা, বালিয়াড়ির আয়তন ও পলিপ্রবাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
উপকূলের এই ক্ষয়ের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, ঢেউ, সাগরের স্রোত, উচ্চ জোয়ার, সৈকতের ভূ-আকৃতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণে বদলে যাচ্ছে উপকূলের চেহারা।
এর বাস্তব চিত্র মিলেছে মাঠেও। গত ১০ সেপ্টেম্বর লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকত ঘুরে অন্তত ১৫টি অংশে ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। সুগন্ধা পয়েন্টে ২৫ বছর ধরে শামুক-ঝিনুকের ব্যবসা করেন আজিজুল হক। তার দাবি, গত পাঁচ বছরে সৈকতের প্রায় ৪০০-৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়েছে। তিন দশক আগে যেখানে পর্যটকদের বসার জন্য চেয়ার-ছাতা বসানো হতো, এখন সেখানে জোয়ারের পানি উঠে আসে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য সিইজিআইএসের করা এক গবেষণায় কক্সবাজারে বছরে গড়ে ৫ দশমিক শূন্য ৫ মিলিমিটার এবং মহেশখালীতে ৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির প্রবণতা পাওয়া গেছে। তবে গবেষকদের মতে, শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে দিয়ে কক্সবাজারের ভাঙন ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে দাবি গবেষক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের। তার ভাষ্য, ২০২৫ সালের পূর্ব উপকূলের গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় পলি সঞ্চয়, নদীপ্রবাহ, ভূপ্রকৃতি, সাগরের স্রোত ও বাতাসের গতিপথও উপকূলের পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা মনে করেন, জোয়ারের ধাক্কায় অনেক জায়গায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে। শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠনে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ উপকূলীয় উদ্ভিদ লাগানো প্রয়োজন।



