ফুলবাড়িয়ায় রোগীর টাকায় চলে তিন কমিউনিটি ক্লিনিক

ছবি: আগামীর সময়
গ্রামের মানুষের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা কমিউনিটি ক্লিনিকে। অথচ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের ঘর ভাড়া, আয়ার বেতন ও বিদ্যুৎ বিল মেটানো হচ্ছে রোগীদের কাছ থেকে টাকা তুলে। জরাজীর্ণ ভবন পরিত্যক্ত হওয়ায় ভাড়া ঘরে চলছে এসব ক্লিনিকের কার্যক্রম। এ ছাড়া উপজেলার ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ২০৭টি ভবন রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভবানীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর বাজার, নাওগাঁও ইউনিয়ন ও পৌরসভার লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে ভাড়া করা কক্ষে। এসব ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৪০ রোগী সেবা নিতে আসেন। তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঘর ভাড়া, আয়ার বেতন, বিদ্যুৎ বিল, খাতা-কলমসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচ মেটানো হচ্ছে।
লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভবনটি পরিত্যক্ত। দরজা-জানালাবিহীন ভবনটি ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর পাশেই লাহিড়ীপাড়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসার একটি ছোট কক্ষে ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে। কক্ষটির মাসিক ভাড়া ৪০০ টাকা। সেখানে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে গাদাগাদি করে বসেন কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারী।
ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা সুমাইয়া আক্তারের ভাষায়, ঘর ভাড়া, আয়ার বেতন ও বিদ্যুৎ বিলের কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় টাকা। অথচ সরকারি এই কেন্দ্রে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা।
শুধু লাহিড়ীপাড়ায় নয়, একই পরিস্থিতি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মহেশপুর বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকেও। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লিনিক থেকে মহেশপুর, জয়পুর, উরপা, যমুনারপাড়, বড়ভিটাসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ সেবা নেন।
ভবনটি প্রায় পাঁচ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে বাজার থেকে প্রায় ৪০০ গজ দূরে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালানো হয়। চার মাস আগে ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে পাশের আরেকটি ঘরের বারান্দায় টিনের ছাপরা তুলে ক্লিনিক স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে এর মাসিক ভাড়া ৬০০ টাকা।
এই ক্লিনিকে হাসিনা খাতুন নামে একজন আয়া মাসে ১ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। ঘর ভাড়া, আয়ার বেতনসহ অন্যান্য খরচ মেটানো হয় রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টাকা দিয়ে। ক্লিনিকটির সিএইচসিপি নাজমুল কবীরের ভাষ্য, পরিত্যক্ত ভবনের দরজা-জানালা ও আসবাব চুরি হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ভাড়া করা ঘরে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে নেওয়া হয়। তবে টাকা চাইলে অনেক রোগী আপত্তি করেন, এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
নাওগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গত বছরের নভেম্বরে সেটিও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর পাশের একটি ঘর মাসে ১ হাজার ১০০ টাকায় ভাড়া নিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন ৩০-৩৫ রোগী সেখানে আসেন। ঘর ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলের খরচও মেটানো হয় রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা দিয়ে।
ভাড়া করা কক্ষে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি উপজেলার আরও কয়েকটি ক্লিনিকের ভবনের অবস্থাও নাজুক। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি ক্লিনিকের ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবনের কোথাও দরজা-জানালা ভাঙা, কোথাও দেয়ালে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়েছে। ছাদের ঢালাই উঠে রড বেরিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি পড়ে ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন সরবরাহ বন্ধ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সাত মাস বন্ধ থাকার পর গত জুনে সরবরাহ আবার শুরু হয়। তবে অ্যামলোডিপিন ৫ মিলিগ্রাম ও মেটফরমিন ৫০০ মিলিগ্রামের মতো ওষুধ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে বাকি ২০ ধরনের ওষুধ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসানুল হোসাইন বলেছেন, ‘ফুলবাড়িয়ায় তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ভাড়া করা ঘরে কার্যক্রম চালাচ্ছে।’ তার ভাষ্য, সেবা নিতে আসা সচ্ছল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২ টাকা নেওয়া যেতে পারে। উপজেলার ৫৩টি ক্লিনিকের মধ্যে ২০টির ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে।



