৩৬ বছরেও নিজস্ব ভবন হয়নি বরগুনা পৌরসভার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরগুনার পাথরঘাটা প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। অথচ নিজস্ব ভবন নেই। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৬ বছর ধরে অন্যের ভবনে চলছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। সেই ভবনটিও নির্মিত হয়েছিল গণগ্রন্থাগারের জন্য। নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় একদিকে নাগরিকসেবা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে পাঠাগারের কার্যক্রম। একটি ভবনের সংকট যেন আটকে রেখেছে দুই ধরনের জনসেবা— নাগরিকসেবা ও জ্ঞানচর্চা।
পৌরসভার তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে প্রায় ১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে পাথরঘাটা পৌরসভা গঠিত হয়। ২০১২ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। পরে ২০২৩ সালে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায়। বর্তমানে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বসবাস। প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হলেও প্রশাসনিক কাজ চলছে পুরনো একটি লাইব্রেরি ভবনে।
ভবনটি ১৯৭৯ সালের দিকে পাথরঘাটা পাবলিক লাইব্রেরির জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। জমি ও ভবনের মালিকানা জেলা পরিষদের। ১৯৯১ সাল থেকে সেখানে পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের কথা থাকলেও তিন দশকের বেশি সময় ধরে সেটিই পৌরসভার কার্যত স্থায়ী কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে ভবনটির বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে।
নিজস্ব ভবন না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে নাগরিকদের। বর্তমান কার্যালয়ে বিভিন্ন শাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। প্রকৌশল ও পানি সরবরাহ শাখার কার্যক্রম চলে আলাদা ভবনে। ফলে একটি সেবা নিতে নাগরিকদের কখনো এক ভবন, কখনো অন্য ভবনে যেতে হয়। কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা মানুষের বসার জায়গাও পর্যাপ্ত নয়। অনেক সময় তাদের দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। প্রশাসনিক কাজ পরিচালনাতেও জায়গার সংকট রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. নাসিরের ভাষ্য, ‘পাথরঘাটা পৌরসভা প্রথম শ্রেণির হলেও অনেক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। পৌরসভার নিজস্ব ভবন না থাকায় সেবা নিতে এসে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’
শুধু পৌর ভবনের সংকটই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাথরঘাটা পাবলিক লাইব্রেরির ভবনও। পৌরসভার কার্যালয় হিসেবে ভবনটি ব্যবহৃত হওয়ায় ১৯৯১ সাল থেকে লাইব্রেরির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ পাঠকদের জন্য শহরে একটি উন্মুক্ত পাঠাগার নেই।
একটি পাঠাগারের অভাবের প্রভাব শুধু বই পড়ার সুযোগ না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস তৈরি, চাকরিপ্রার্থীদের প্রস্তুতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা এবং স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও পাঠাগারের ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পাথরঘাটার মানুষ।
সমাজকর্মী মেহেদী হাসান মনে করেন, পাথরঘাটা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৬ বছর পরও নিজস্ব ভবন না থাকা দুঃখজনক। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে এখানে একটি আধুনিক পৌরভবন প্রয়োজন। নিজস্ব ভবন হলে নাগরিকরা এক জায়গা থেকে বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাবলিক লাইব্রেরিটিও চালু করা সম্ভব হবে।
সাংবাদিক মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদের আক্ষেপ, ১৯৯০ সালের পর থেকে পাথরঘাটা পাবলিক লাইব্রেরির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ বই পড়া ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি মনে করেন, ভবনটি দ্রুত পাঠাগারের কাজে ফিরিয়ে দিয়ে নিয়মিত বই পড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
পাথরঘাটার সামগ্রিক নাগরিকসেবার চিত্রও এই সংকটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙাচোরা ও অপ্রশস্ত সড়ক, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার অভিযোগ রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও পানি জমে যায়। সুপেয় পানির সংকটও দীর্ঘদিনের। পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর থেকে পানি সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।
পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাথরঘাটা পৌরসভার প্রশাসক তাপস পাল বললেন, ‘পৌরসভার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে নিজস্ব পৌরভবন প্রয়োজন। এজন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। উপযুক্ত জমি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পৌরভবন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হবে। অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’



