কেশবপুরে ৫০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মাটির খেলনা

ছবি: আগামীর সময়
শারদীয় দুর্গাপূজা এলেই যশোরের কেশবপুর শহরের শ্রী শ্রী কালীমন্দির প্রাঙ্গণে বসে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, পশুপাখির প্রতিকৃতি ও নানা রকম খেলনার জমজমাট পসরা। রঙিন এসব মাটির সামগ্রী ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের বাড়তি আমেজ। প্রায় ৫০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মৃৎশিল্পের ইতিহাস, মানুষের শৈশবের স্মৃতি আর ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার এক সুন্দর গল্প।
এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন মৃৎশিল্পী নয়ন কুমার পাল ও জয়ন্ত কুমার পাল। নিজেদের হাতে তৈরি মাটির নানা সামগ্রী নিয়ে প্রতিবছরই দুর্গাপূজা উপলক্ষে হাজির হন তারা। তাদের দোকানজুড়ে সাজানো থাকে লাল, সবুজ, হলুদসহ নানা রঙে রাঙানো মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, পশুপাখির প্রতিকৃতি ও শিশুদের পছন্দের খেলনা। বাহারি এসব পণ্যের দিকে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়ান পথচারীরা। উৎসবের কেনাকাটার পাশাপাশি মাটির খেলনা কিনতে ভিড় করেন শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ।
শিশুদের আনন্দে প্রাণ ফিরে পায় পুরোনো ঐতিহ্য
দুর্গাপূজা উপলক্ষে কালীমন্দিরের পাশে বসা এই মাটির সামগ্রীর দোকান শিশুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলায় আসা শিশুরা পছন্দের পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল কিংবা পশুপাখির খেলনা কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ পছন্দ করে রঙিন পুতুল, কেউবা ছোট্ট মাটির হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে মেতে ওঠে কল্পনার খেলায়।
এসব খেলনার প্রতি আকর্ষণ শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের পরিবারের শিশুরাও মাটির খেলনা কিনতে আসে। উৎসবের আনন্দে শিশুদের এই অংশগ্রহণ সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক সুন্দর চিত্র তুলে ধরে।
আধুনিকতার ভিড়েও টিকে আছে মাটির শিল্প
সময়ের পরিবর্তনে বাজারে প্লাস্টিক ও আধুনিক উপকরণে তৈরি খেলনার প্রচলন বেড়েছে। শিশুদের হাতে এখন নানা ধরনের আধুনিক খেলনা দেখা গেলেও মাটির তৈরি খেলনা ও হাঁড়ি-পাতিলের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো কমেনি। বিশেষ করে, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে এসব সামগ্রী নতুন প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাটির তৈরি এসব পণ্য কেবল কেনাবেচার উপকরণ নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের কাজ এবং গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা স্মৃতি। মাটি দিয়ে বিভিন্ন আকৃতির সামগ্রী তৈরি করা, সেগুলো শুকিয়ে রঙের ছোঁয়ায় আকর্ষণীয় করে তোলা—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় দক্ষতা, ধৈর্য ও সৃজনশীলতার।
নয়ন কুমার পাল ও জয়ন্ত কুমার পালের মতো কারিগরেরা নিজেদের শ্রম ও দক্ষতায় সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের তৈরি সামগ্রী একদিকে যেমন শিশুদের আনন্দ দেয়, অন্যদিকে তেমনি মানুষের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে।
ঐতিহ্যের টানে ফিরে আসে মানুষ
প্রায় ৫০ বছরের এই আয়োজন কেশবপুরের দুর্গাপূজার উৎসবকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। প্রতিবছর পূজা এলেই মাটির খেলনার এই পসরা স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত এক দৃশ্যে পরিণত হয়। উৎসবের কেনাকাটার পাশাপাশি অনেকেই পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করে এসব সামগ্রী কিনে নেন। শিশুদের আনন্দ আর বড়দের নস্টালজিয়া মিলেমিশে দোকানটিকে করে তোলে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
তবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের নিরলস প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের হাতের তৈরি পণ্য কেবল একটি পেশার পরিচয় নয়, বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।
সব মিলিয়ে কেশবপুর শহরের শ্রী শ্রী কালীমন্দির প্রাঙ্গণের মাটির খেলনার পসরা শুধু একটি অস্থায়ী দোকান নয়; এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শৈশবের আনন্দ, লোকজ কারুশিল্প ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। নয়ন কুমার পাল ও জয়ন্ত কুমার পালের হাত ধরে প্রায় ৫০ বছরের এই ঐতিহ্য আজও দুর্গাপূজার আনন্দে নতুন রং ছড়াচ্ছে।



