শিবচরে ঋণ নিয়ে ‘মরণফাঁদে’ শতাধিক গ্রাহক

ছবি: আগামীর সময়
মাদারীপুরের শিবচরে গণ উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে ঋণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, চক্রবৃদ্ধি সুদ, গ্রাহকদের কাছ থেকে ‘ব্ল্যাংক চেক’ নেওয়া এবং ঋণ পরিশোধের পরও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধের দাবিতে আমরণ অনশন করেছেন সমিতির ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) শিবচর উপজেলা পরিষদের সামনে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে নারী-পুরুষসহ প্রায় শতাধিক ভুক্তভোগী অংশ নেন। অনশন চলাকালে অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের আর্থিক দুর্দশা, মামলা ও হয়রানির কথা তুলে ধরেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সংসারের অভাব মেটাতে তারা গণ উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের পর কোনো কারণে দু-এক কিস্তি দিতে দেরি হলে তাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থের চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে মূল ঋণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করে মামলা করা হচ্ছে।
কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, ঋণ নেওয়ার সময় তাদের কাছ থেকে ব্যাংকের স্বাক্ষর করা চেক, যাকে তারা ‘ব্ল্যাংক চেক’ বলছেন, জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ঋণ পরিশোধের পরও ওই চেক ফেরত দেওয়া হয়নি বলে দাবি তাদের। এসব চেক ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মামলা বা আইনি জটিলতায় ফেলার আশঙ্কাও করছেন তারা।
শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা হাসান মৃধা বলেন, ২০২১ সালে বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশে গণ উন্নয়ন সমবায় সমিতি থেকে তিনি ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তার দাবি, পরবর্তী সময়ে তিনি ঋণের টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে প্রতিষ্ঠানটি তার কাছে এখনো টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করছে।
হাসান মৃধা বলেন, আমি ২০২১ সালে গণ উন্নয়ন থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম এবং সেই টাকা পরিশোধ করেছি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে, আমার কাছে তারা টাকা পায়। আমার প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে এসে কীভাবে আমার কাছে এখনো টাকা পাওনা থাকে? আমি এ হয়রানির বিচার চাই।আমার এলাকার আরও অনেক পরিবার একই ধরনের আর্থিক জটিলতায় পড়েছে।
অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আরেক ভুক্তভোগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গণ উন্নয়ন আমাদের শেষ করে দিয়েছে। আমি এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। আমার বউ-বাচ্চা চলে গেছে। ঋণের চিন্তায় আমার মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আবুল হাশেম মিয়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, অভাবের সময় যে ঋণ তাদের কাছে সংসার চালানোর অবলম্বন ছিল, সেটিই এখন অনেকের কাছে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামলা, অতিরিক্ত অর্থের দাবি ও কিস্তির চাপ সামলাতে গিয়ে কেউ কেউ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বলে তাদের দাবি।
অনশনকারীরা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে সমিতির বিরুদ্ধে চক্রবৃদ্ধি সুদ, ঋণের বিপরীতে ব্ল্যাংক চেক গ্রহণ এবং মূল ঋণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ দাবি করে মামলা করার অভিযোগ রয়েছে। তাদের আরও দাবি, ঋণের টাকা পরিশোধে সামান্য বিলম্ব হলেই গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এসব মামলায় অনেককে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। কয়েকজন গ্রাহক কারাগারে রয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
মামলার কারণে অনেক পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, মামলা হওয়ার পর দাবি করা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ না করলে জামিন পেতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অনশন কর্মসূচির খবর পেয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। তিনি অনশনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অভিযোগ শোনেন।
এ সময় ইউএনও ভুক্তভোগীদের সব অভিযোগ লিখিতভাবে উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অনশন ও অবস্থান কর্মসূচির খবর পেয়ে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিযোগ শোনেন এবং সমস্যা সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় তিনি বলেন, আগামী ১৫ তারিখে তদন্ত হওয়ার আগে ভুক্তভোগীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি বা গ্রেপ্তারের শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বলবেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে গণ উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হাশেম মিয়া অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগকারীদের অধিকাংশ অভিযোগই মিথ্যা। টাকা নিয়ে যদি টাকা পরিশোধ না করে, তাহলে মামলা তো দেবই। আর মামলা করে উকিল কত টাকার মামলা করেছে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এসব মামলার বাদী হন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।
আবুল হাশেম মিয়া আরও বলেন, বর্তমানে সমিতির প্রায় শতাধিক গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে। কারও কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সমিতির কার্যালয়ে এসে তা জানালে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
ভুক্তভোগীদের প্রধান দাবি, সমিতির ঋণ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ঋণের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে মামলা বন্ধ, হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া কথিত ব্ল্যাংক চেকের বিষয়ে তদন্ত এবং ঋণগ্রহীতাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে চান। তবে মূল ঋণ ও বৈধ হিসাবের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের চাপ এবং মামলা দিয়ে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সমবায় কর্মকর্তা ও সমিতি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অভাবের সময় নেওয়া ঋণ যদি একপর্যায়ে মামলা, অতিরিক্ত অর্থের দাবি ও হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এর দায় ও বাস্তব চিত্র কী এ প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন শিবচরের ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। প্রশাসনিক তদন্তেই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা তাদের।



