দুধকুমার নদে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

ছবি: আগামীর সময়
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে দুধকুমার নদ। বর্ষায় তাণ্ডব চালানো এ নদ এখন শান্ত। তবে গভীর রাতে নদটির বুকে ঘটছে অমানবিক ঘটনা। ব্যাটারি ও ইনভার্টারের সাহায্যে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্বিচারে মারা হচ্ছে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুধকুমার নদে অসাধু মাছ শিকারিদের আনাগোনা বাড়ে। নৌকায় স্থাপিত ব্যাটারি ও ইনভার্টারের সাহায্যে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে অন্য উপজেলা থেকে আসা একটি চক্র এ পদ্ধতিতে নিয়মিত মাছ ধরছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পানিতে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ করলে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা যায়। পরে লম্বা বাঁশের মাথায় লাগানো হাতজাল দিয়ে ভেসে ওঠা মাছ সংগ্রহ করে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা হয়।
এ পদ্ধতিতে ছোট-বড় মাছ, মাছের পোনা, শামুক, সাপ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও ক্ষুদ্র জীব মারা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
দুধকুমার নদপাড়ের বাসিন্দা জুলহাস, শফিকুল ও ফরিদুল জানান, একসময় দুধকুমার নদ দেশীয় মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল। এ নদে বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, টেংরা, পাবদা, পুঁটি, চিংড়ি, বাইম, কর্তি, বৈরালী, পিয়ালি, চান্দা ও খলিসাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি জাল ও বৈদ্যুতিক শকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো দেশীয় মাছ মিলছে না।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভূরুঙ্গামারী বাজারে কথা হয় নলেয়া মাঝিটারী গ্রামের সাইফুর রহমানের সাথে। তিনি জানান, আগে দুধকুমার নদীতে সারা দিন জাল দিয়ে মাছ ধরলে আড়াই থেকে তিন কেজি মাছ পাওয়া যেত। আর আজ সারাদিন মাছ ধরে মাত্র ৫৫০ গ্রাম মাছ পেয়েছি। কারেন্ট শক দিয়ে মাছ মারায় নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হাফিজুর রহমান জানান, বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধারার ফলে মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যা মৎস্য আইন বহির্ভূত। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ভূরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুনতাসির মামুন মুন জানান, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ অপরাধে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে রাতে মাছ ধরায় অপরাধীদের শনাক্ত করতে সমস্যা হচ্ছে। তারপরও তারা আইনের আওতা থেকে রেহাই পাবে না। অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তৌহিদা মোহতামিম জানান, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাতের আঁধারে মাছ শিকার করায় জড়িতদের শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে। অবৈধ মাছ শিকারিদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।



