মহালয়ার আবাহনে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি

দুর্গাপূজা সন্নিকটে। তাই প্রতিমা শিল্পীরা দিনরাত কর্মব্যস্ততায় কাটছে প্রতিমা শিল্পালয়গুলোতে। চট্টগ্রাম সদরঘাট প্রতিমা শিল্পালয় থেকে দুপুরে তোলার ছবি। রনি দে
রাত বাড়ে, কিন্তু কাজের ব্যস্ততা কমে না। মাটি, খড় আর বাঁশের কাঠামোয় তৈরি দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তুলতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন প্রতিমাশিল্পীরা। কেউ ব্যস্ত প্রতিমার অলংকার সজ্জায়, আবার কেউ শেষ করছেন মাটির সূক্ষ্ম কাজ। উৎসবের দিন ঘনিয়ে আসায় এখন দম ফেলার ফুরসত নেই।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে আজ শনিবার দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। চণ্ডীপাঠ, আগমনী সুর ও দেবী দুর্গার চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা। প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন আয়োজকরা। এবার চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ২ হাজার ৫৬৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে জেলায় ২ হাজার ২৭৪টি এবং মহানগরে ২৯৪টি মণ্ডপ রয়েছে।
মহালয়া উপলক্ষে কোনো কোনো মণ্ডপে পূজা এবং দেবীর চোখ ফোটানোর মাঙ্গলিক আয়োজনও চলছে। দেবীপক্ষের সূচনার মধ্য দিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে লেগেছে পূজার আবহ। প্রতিমাশিল্পীদের মতো প্রতিটি মণ্ডপে চলছে সাজসজ্জাসহ নানা প্রস্তুতি। এ ছাড়া পূজার সরঞ্জাম কেনার তোড়জোড়ও চলছে। আর নিজ নিজ মণ্ডপের প্রতিমা এগোলো কত দূর সেই তাড়াও দেওয়া হচ্ছে শিল্পীদের।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি ও সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত শিল্পীরা। সদরঘাটের লোকনাথ শিল্পালয়ে প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন শান্তি পাল। তিনি জানান, 'পূজা শুরু হতে আর বেশিদিন বাকি নেই। দুই দিন আগে থেকেই প্রতিমা সরবরাহ শুরু হয়েছে। এখন কাজের চাপ অনেক বেশি। রাত প্রায় ৪টা পর্যন্ত কাজ চলছে। এখানে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি প্রতিমা রয়েছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান ও কুমিরাসহ কক্সবাজারেও এখান থেকে প্রতিমা সরবরাহ করা হয়।’
প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপেই রয়েছে আলাদা কারিগরি দক্ষতা। প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি করা হয় কাঠামো। এরপর দেওয়া হয় মাটির প্রলেপ। মাটি শুকিয়ে গেলে চলে ঘষামাজা ও সূক্ষ্ম কারুকাজ। সবশেষে রঙ, পোশাক ও অলংকারে পূর্ণতা পায় প্রতিমা।
দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমাও তৈরি করতে হয় একই যত্নে।
এখন অনেক প্রতিমার কাঠামো ও মাটির কাজ শেষ। প্রতিমার মুখ ও চোখের সূক্ষ্ম কাজ করছেন শিল্পীরা। কেউ পোশাক ও অলংকার সাজাচ্ছেন, কেউ তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবদেবীর অবয়ব। প্রতিটি প্রতিমায় নিজস্ব নকশা ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে দিতে হচ্ছে বাড়তি মনোযোগ।
প্রতিমা নির্মাণ শুধু মাটি দিয়ে অবয়ব তৈরির কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সৃষ্টিশীলতা ও নিপুণতা। দেবীর মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা, হাতের ভঙ্গি কিংবা পোশাকের নকশা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় দক্ষতার। সামান্য অসংগতিও প্রতিমার সৌন্দর্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সময়ের চাপ থাকলেও কাজের মান ধরে রাখার চেষ্টা করেন তারা।
তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। আর সেই প্রতিমাকে ঘিরেই পূজামণ্ডপে শিগগিরই শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি দুর্গোৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতি চলে পূজার নানা অনুষঙ্গেও। মাইক, ঢাকঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের ব্যস্ততাও বেড়েছে দুর্গোৎসবকে ঘিরে।
এ ছাড়া দেবীর তাজ ও অলংকার তৈরির কিছু আলাদা শিল্পী রয়েছেন। তারাও কয়েক মাস আগে থেকে বিভিন্ন কারুকাজ এবং নকশার তাজ তৈরি করে চলেছেন।



