ইউনিফর্মের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেন, কুকি-চিনের নাথান বমের বিরুদ্ধে মামলা

নাথান বম
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)’। একবছর আগে চট্টগ্রামে সংগঠনটির সদস্যদের প্রায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়েছিল। সেই ইউনিফর্ম তৈরির জন্য অজ্ঞাত উৎস থেকে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা লেনদেন করেছে কেএনএফ।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির আর্থিক অনুসন্ধানে এ আর্থিক প্রবাহে মানিলন্ডারিংয়ের গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় সিআইডির একজন কর্মকর্তা গতকাল বুধবার রাতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ধারায় একটি মামলা করেছেন। বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মোহাম্মদ ইখতিয়ার উদ্দিন মামলার বিষয়টি আগামীর সময়কে জানিয়েছেন।
মামলায় কেএনএফ’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নাথান বমসহ নয়জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যরা হলেন- মংহলাসিন মারমা মং, নিয়াজ হায়দার, গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, তৌহিদুল ইসলাম এবং মতিউর রহমান। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থের যোগান ও সংঘবদ্ধ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ করা হয়েছে।
কেএনএফ’র সামরিক কায়দার পোশাকের প্রথম ও সবচেয়ে বড় চালানটি ধরা পড়ে ২০২৫ সালের ১৭ মে রাতে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার নয়ারহাট এলাকার রিংভো অ্যাপারেলস নামের একটি পোশাক কারখানা এবং পাশের মুজাফফরনগর এলাকার গুদামে অভিযান চালিয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে ২০ হাজার ৩০০ ইউনিফর্ম। গ্রেপ্তার করা হয় রিংভো অ্যাপারেলসের মালিক সাহেদুল ইসলাম, পোশাক তৈরির আদেশদাতা গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দারকে।
তাদের তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ মে রাতে ১১ হাজার ৭৮৫ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয় নয়ারহাট এলাকার আরেকটি গুদাম থেকে। পরদিন রাতে নগরীর পাহাড়তলী থানার ডিটি রোড এলাকার নূর ফ্যাশন অ্যান্ড গার্মেন্টস কারখানায় অভিযান চালিয়ে আরও ১৫ হাজার ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় নূর ফ্যাশনের মালিক মতিউর রহমানকে।
তিন চালানে জব্দ করা মোট ইউনিফর্মের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৮৫টি। এরপর ২ জুন রাতে নগরীর কালুরঘাটে ‘ওয়েল কমপোজিট নিট কেমিক্যাল ফেব্রিকস ডাইং’ কারখানায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরা হলেন- তারিকুল ইসলাম, তৌহিদুল ইসলাম, আতিকুর রহমান ও জামালুল ইসলাম। পুলিশের ভাষ্যমতে, ওয়েল কমপোজিট থেকে ইউনিফর্ম তৈরির সূতা ও কাপড় সরবরাহ করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার হওয়া তারিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুচ ছালামের ছোট ভাই। ছালাম সাবেক সংসদ সদস্য ও সিডিএ চেয়ারম্যান। ওয়েল কমপোজিটের মালিক প্রতিষ্ঠান ওয়েল গ্রুপ তাদের পারিবারিক মালিকানায় থাকা শিল্পগোষ্ঠী।
এ ঘটনায় করা একাধিক মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি। সংস্থাটি ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, তাদের ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ লেনদেন, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্টদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে। অর্থের উৎস, ব্যবহারসহ অর্থ প্রবাহের চিত্রও অনুসরণ করে সিআইডি।
এর ভিত্তিতে সিআইডি বলছে, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা মং প্রথমে যোগাযোগ করেন নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে। নিয়াজ তার সঙ্গে গোলাম আজমের যোগাযোগ করে দেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের কাপড় তৈরির ব্যবস্থা করেন।
মংহলাসিন মারমা নিজেকে এমআই এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ও পরের বছর ১০ ফেব্রুয়ারি দুটি ক্রয়াদেশ দাখিল করেন। এজন্য ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।
এরপর কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের প্যান্ট ও শার্ট সেলাইয়ের জন্য মংহলাসিন মারমার নির্দেশে নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ৭২ লাখ টাকা। সিআইডি কেএনএফের প্রতিনিধি মংহলাসিন মারমার মাধ্যমে চেক ও নগদে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে।
সিআইডি বলছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে নাথান বমের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।




