কেমোথেরাপিতে ক্যানসারমুক্ত অজগর

মানুষের ক্যানসার সারানোর চিকিৎসায় বাঁচল ১৫ ফুটের এক অজগরের প্রাণ! ৫০ কেজি ওজনের অজগর; যার পুরো শরীরের জায়গা হয় না সাধারণ অস্ত্রোপচারের টেবিলে। সেই বিশাল সাপটির চোয়ালে বাসা বেঁধেছিল প্রাণঘাতী ক্যানসার। অস্ত্রোপচার করেও যখন তাকে বাঁচানো যাচ্ছিল না, তখন চিকিৎসকরা বেছে নিলেন মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত এক বিশেষ পদ্ধতি। আর তাতেই মিলল সাফল্য। চিকিৎসার পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে ২৩ বছর বয়সী অজগরটি। ‘রেটিকুলেটেড পাইথন’ বা জালিদার এই অজগরটির ঠিকানা যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত চেস্টার চিড়িয়াখানা। কিছুদিন আগে হঠাৎ কম খাবার খেতে শুরু করে অজগরটি। কমে যায় তার চলাফেরাও। এতে চিন্তায় পড়ে যান চিড়িয়াখানার পরিচর্যাকারীরা।
পরে শারীরিক পরীক্ষা করে তার চোয়ালে শনাক্ত হয় ফাইব্রোসারকোমা নামের একটি ম্যালিগন্যান্ট ক্যানসার টিউমার। প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণ করা হলেও কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে সেটি। এবার টিউমারটি আক্রমণ শুরু করে চোয়ালের হাড়েও। কঠিন হয়ে পড়ে খাবার খাওয়াও।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে ভেটেরিনারি চিকিৎসকরা প্রচলিত চিকিৎসার বাইরে গিয়ে খুঁজতে শুরু করেন নতুন উপায়। পরে সিদ্ধান্ত হয় মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ইলেকট্রোকেমোথেরাপি’ পদ্ধতি ব্যবহারের।
চিকিৎসার কয়েক মাস পর এখন পুরোপুরি সুস্থ অজগরটি। সবশেষ পরীক্ষায় তার শরীরে আর কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি ক্যানসারের। এটি খাবার খাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে এবং আগের মতোই হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও দুরন্ত।
ইলেকট্রোকেমোথেরাপি মূলত ক্যানসার কোষ ধ্বংসে ব্যবহৃত একটি বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতি। এতে ক্যানসারের ওষুধের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক পালস ব্যবহার করা হয়। বৈদ্যুতিক স্পন্দনের ফলে ক্যানসার কোষের দেয়াল সাময়িকভাবে বেশি উন্মুক্ত হয়ে যায়। এতে ওষুধটি কোষের ভেতরে সহজে প্রবেশ করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে পারে।
অজগরটির চিকিৎসার আগে চেতনানাশক দেওয়া হয় নিজস্ব আবাসস্থলেই। এরপর সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হয় চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি কেয়ার সেন্টারে। এটি আকারে এতটাই বড় যে, সাধারণ অস্ত্রোপচারের টেবিলে সম্ভব হয়নি রাখা। তাই দুটি বড় টেবিল পাশাপাশি জুড়ে ডাবল বেডের মতো তৈরি করা হয় একটি প্ল্যাটফর্ম।
প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চলে অস্ত্রোপচার। ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ইয়ান অ্যাশপোল প্রথমে টিউমারের আক্রান্ত অংশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত চোয়ালের কিছু হাড় অপসারণ করেন। এরপর ক্যানসারের অবশিষ্ট কোষ ধ্বংস করতে প্রয়োগ করা হয় ইলেকট্রোকেমোথেরাপি। এতে ক্যানসারের ওষুধ ব্লিওমাইসিনের সঙ্গে ব্যবহার করা হয় নির্দিষ্ট মাত্রার বৈদ্যুতিক স্পন্দন।
বিশ্বে কোনো সাপের শরীরে এ পদ্ধতি ব্যবহারের নজির এটিই প্রথম দাবি করে ইয়ান অ্যাশপোল জানিয়েছেন, টিউমারটি দ্বিতীয়বার ফিরে এসে চোয়ালের হাড়ের ক্ষতি করতে শুরু করায় তারা বুঝতে পারেন, শুধু অস্ত্রোপচার যথেষ্ট নয়। তাই ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে মানুষের ইলেকট্রোকেমোথেরাপির পদ্ধতিকে অজগরটির জন্য উপযোগী করা হয়।
চিড়িয়াখানায় অজগরটির প্রথম আগমনের সময় নথিতে তার পরিচিতি হিসেবে লেখা ছিল ‘জেএফ’; যার পূর্ণরূপ ছিল ‘জুভেনাইল ফিমেল’। পরে এই সংক্ষিপ্ত নাম থেকেই হলিউড অভিনেত্রী জোডি ফস্টারের নাম অনুসারে তার নাম রাখা হয় ‘জোডি ফস্টার’।






