ম্যালেরিয়ামুক্ত সুন্দর পৃথিবীর প্রত্যাশায়

সংগৃহীত ছবি
রাত নামলেই যেন অদৃশ্য এক শত্রু ঘিরে ফেলে মানুষকে। কানে ভেসে আসে খুব সরু এক গুঞ্জন। একটি মশা। দেখতে সাধারণ মনে হলেও ছোট্ট একটি মশার কামড়ও যে কোনো মানুষের জীবন মুহূর্তেই বিষাদময় করে তুলতে পারে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই অতি ক্ষুদ্র প্রাণীর কাছে বারবার অসহায় হতে হয়েছে আমাদের। যেসব ভয়াবহ রোগের বাহক এই ছোট্ট প্রাণীটি তার একটির গল্প। হঠাৎ জ্বর, কাঁপুনি, শরীর ভেঙে পড়া, সবমিলিয়ে এ যেন এক অজানা আতঙ্ক। কারও কারও ভাগ্যে থাকে মৃত্যু। একসময় মানুষ মনে করত, এটি কোনো অশুভ শক্তির অভিশাপ কিংবা দূষিত বাতাসের কারসাজি। তবে আজ আমরা জানি, সেই অদৃশ্য ঘাতকের নাম ম্যালেরিয়া।
আজ বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় দিবসটি। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। শত শত বছর ধরে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া এই রোগটি আমাদের লড়াই ও প্রতিরোধের এক বড় পরীক্ষা। বর্তমানে প্রকৃতিতে নানা পরিবর্তনে অসময়ে বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দেশে মশার বংশবিস্তার অনেক বেড়ে গেছে। ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস মশার সংখ্যাও।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে বাংলাদেশে ৪৬০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ১৫৩ এবং প্রতিদিন ৫ জনের বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশের ১৩টি জেলা এখনো ম্যালেরিয়ার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে বিশেষ করে বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজার জেলায় সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে ম্যালেরিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘Driven to End Malaria : Now We Can. Now We Must’ অর্থাৎ ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে বদ্ধপরিকর: এখনই আমরা পারি, এখনই আমাদের করতে হবে’। এর মাধ্যমে ম্যালেরিয়া নির্মূলে নতুন প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ম্যালেরিয়ার ইতিহাস অনেক পুরনো। হাজার বছর আগে প্রাচীন চীন এবং রোমান সভ্যতায় এই রোগের লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইতালীয় শব্দ 'মালা এরিয়া' থেকেই মূলত ম্যালেরিয়া নামের উৎপত্তি যার অর্থ হলো 'খারাপ বাতাস'। আগে মানুষ মনে করত দূষিত বাতাসের কারণে এই রোগ হয়। তবে ভুল ধারণাটি ভাঙে ১৮৮০ সালে। ফরাসি চিকিৎসক চার্লস ল্যাভেরান প্রথম মানুষের রক্তে ম্যালেরিয়ার জীবাণু খুঁজে পান। ১৭ বছর পর ১৮৯৭ সালে স্যার রোনাল্ড রস প্রমাণ করেন যে, স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা এ রোগের প্রধান বাহক। এ আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
বিশ্বের অনেক দেশেই একসময় ম্যালেরিয়া ছিল মারাত্মক সমস্যা। বিশেষ করে আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে এ রোগ মহামারি আকার ধারণ করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বন্দুকের গুলির চেয়ে ম্যালেরিয়ায় বেশি সৈন্য মারা গিয়েছিল। এখনো প্রতি বছর বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয় এবং একটি বড় অংশ প্রাণ হারায় যাদের বেশিরভাগই হলো শিশু।
একসময় ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায়ও ম্যালেরিয়া দেখা যেত। কিন্তু উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পরিষ্কার পরিবেশ এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কারণে এসব এলাকায় এখন রোগটি প্রায় নেই বললেই চলে। তবে কয়েক দশক আগেও প্রতি বছর বিশ্বে কয়েক কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতো। মারা যেত লাখ লাখ শিশু। আফ্রিকার অনেক দেশে ম্যালেরিয়ার কারণে উন্নয়ন থমকে গিয়েছিল। পরিবারগুলো চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যেত। আজও বিশ্বের অনেক দেশে ম্যালেরিয়া একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে দুর্গম বন এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় একসময় গাছের ছাল বা শিকড় ব্যবহার করা হতো। পেরুর 'সিনকোনা' গাছের ছাল থেকে তৈরি কুইনাইন ছিল ম্যালেরিয়ার প্রথম কার্যকর ওষুধ। পরে বিজ্ঞানীরা ক্লোরোকুইন এবং আর্টেমিসিনিনভিত্তিক ওষুধ আবিষ্কার করেন, যা মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখে। তবে বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন ম্যালেরিয়ার পরজীবীগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। শুধু ওষুধ দিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিজ্ঞানীরা ম্যালেরিয়ার টিকা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০২১ সালে প্রথম আরটিএস এস নামের টিকা অনুমোদন পায়। এরপর আর ২১ নামক আরও একটি টিকা বড় বড় ট্রায়ালে সফল হয়েছে। এই টিকা আবিষ্কার ম্যালেরিয়া নির্মূলের পথে এক বিশাল মাইলফলক। এখন হাজারো শিশুর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে এই টিকার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু ম্যালেরিয়া বিস্তারের জন্য অনুকূল। দেশের ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই জেলাগুলো মূলত ভারতের সীমান্ত এবং পাহাড়ি এলাকা ঘেঁষে অবস্থিত। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর বড় একটি অংশ পাওয়া যায়। এ ছাড়া কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং নেত্রকোনা জেলায়ও ম্যালেরিয়ার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এই এলাকাগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার অবস্থা আগের তুলনায় অনেক নিয়ন্ত্রিত। আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে এবং মৃত্যুর হারও কমেছে। তবুও এটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় এখনো নতুন রোগী পাওয়া যায়। তাই নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত চিকিৎসা এবং সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি।
ম্যালেরিয়া নির্মূলে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সচেতনতা। মানুষ যদি জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা না করায় তবে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। বাংলাদেশ এখন ম্যালেরিয়া নির্মূলের শেষ ধাপে রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫১টি জেলা এখন ম্যালেরিয়ামুক্ত হিসেবে ধরা হয়। বাকি ১৩টি জেলায় কাজ চলছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা আর জনসচেতনতা বজায় থাকলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশ একটি ম্যালেরিয়ামুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তাই আমাদের সবার লক্ষ্য হোক একটি সুস্থ নিরাপদ এবং ম্যালেরিয়ামুক্ত সুন্দর পৃথিবী।


