ভালুকেরও আছে জেলখানা!

কানাডার উত্তরের শহর চার্চিলে আছে ভালুকের জেলখানা। ছবি: সংগৃহীত
কানাডার ছোট্ট শহর চার্চিল। এক সকালে সংরক্ষণ কর্মকর্তা ক্যাজার ম্যাকলিন একটি ফোন পেলেন। শহরের শেষ প্রান্তের এক গুদামঘরে একটি মেরু ভালুক ঢুকে পড়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, একটি অল্প বয়স্ক মেয়ে ভালুক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খাবার খাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে সে শহরের আশপাশে ঘুরছিল খাবারের খোঁজে। কিন্তু এখন সে বুঝে গেছে, মানুষের ঘরেই খাবার পাওয়া যায়। আর এ বিষয়টাই ভয়ের। কারণ একবার যদি ভালুক মানুষের ঘরকে খাবারের উৎস মনে করে, তবে সেটি বারবার ফিরে আসবে। এরা মানুষের বাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়তে পারে। তাই দেরি না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ভালুকটিকে অজ্ঞান করে মেরু ভালুকদের জন্য তৈরি বিশেষ জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হবে।
না, ভুল শুনেননি। ভালুকের জেলখানা। বিশ্বের একমাত্র ভালুকের জেলখানাটির অবস্থান চার্চিলে।
৫০০ পাউন্ড ওজনের একটি ভালুককে অজ্ঞান করা মোটেও সহজ কাজ নয়। তাই তাকে ধরতে আকাশ এবং মাটি দুই দিক থেকেই অভিযান চালানো হলো। হেলিকপ্টার থেকে ম্যাকলিনের সঙ্গী ইয়ান ভ্যান নেস্ট একটি বিশেষ বন্দুক দিয়ে ভালুকটির শরীরে চেতনানাশক ইনজেকশন ছুড়লেন। ওষুধটি কাজ করতে মাত্র দুই মিনিট সময় নিল। কিন্তু এর মধ্যেই ভালুকটি এমন এক উঁচু জায়গায় গিয়ে অচেতন হলো, যেখানে কোনো গাড়ি পৌঁছানো সম্ভব নয়। শেষে সাতজন মিলে একটি বড় বোর্ডের মতো স্ট্রেচারে করে জন্তুটিকে তুলে নিয়ে ট্রাকে তোলা হয়। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পোলার বিয়ার হোল্ডিং ফ্যাসিলিটিতে।
চার্চিল শহরটি যেন মেরু ভালুকদের রাজত্ব। ১৭১৭ সালে পশম ব্যবসার জন্য গড়ে ওঠা এই জনপদটি এখন বিশ্বের মেরু ভালুকদের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। শহরটি হাডসন বের তীরে অবস্থিত এবং ঠিক সেই পথের ওপর পড়েছে যে পথ দিয়ে ভালুকরা প্রতি বছর সমুদ্রে বরফ জমার অপেক্ষায় যাতায়াত করে। এই শহরে মানুষের সংখ্যা মাত্র ৮৫০ জন। এখানে ঘুরে বেড়ানো ভালুকদের সংখ্যাও প্রায় সমান। শীতকালে এই ভালুকরা হাডসন বের জমাট বাঁধা বরফের ওপর সিল মাছ শিকার করে। কিন্তু জুলাই মাসে যখন বরফ গলতে শুরু করে তখনই গোলটা বাধে। এই সময় তাদের হাতে কোনো শিকার থাকে না। শীতের এই সময়টাতে তারা মূলত শরীরের জমানো চর্বি পুড়িয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু নভেম্বর আসতে আসতে তারা ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে এবং খাবারের খোঁজে লোকালয়ে হানা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে চার্চিলে চালু হয়েছে পোলার বিয়ার অ্যালার্ট প্রোগ্রাম। আগেকার দিনে কোনো ভালুক মানুষের জানালায় থাবা দিলে বা ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলে সেটিকে গুলি করে মেরে ফেলা হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই মানসিকতা বদলেছে। পৃথিবীতে এখন মাত্র ২০ থেকে ২৬ হাজার মেরু ভালুক অবশিষ্ট আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং ভালুকের সংখ্যাও কমছে। তাই তাদের জীবন বাঁচাতে এবং মানুষকে নিরাপদ রাখতেই এই জেলখানা ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে এদের সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের বরফ দেরিতে জমছে, যার ফলে ভালুকরা শিকারের সময় কম পাচ্ছে। তাই এখন চেষ্টা করা হয় কোনো ভালুক না মেরে তাকে আটকে রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিতে।
চার্চিল শহরের এই জেলখানাটি মূলত ১৯৫০-এর দশকে একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এটি একটি বিশাল হ্যাঙ্গার, যেখানে ২৮টি কক্ষ বা সেল রয়েছে। প্রতিটি কক্ষ শক্ত সিমেন্টের ব্লক দিয়ে তৈরি এবং এর ছাদ ও দরজা মজবুত স্টিল দিয়ে ঘেরা। এই জেলটির গঠন এতটাই শক্তিশালী যে, শুধু সেনাবাহিনীর পক্ষেই এমন জায়গায় এটি নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। এই জেলখানার পাঁচটি কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও রয়েছে, যাতে গরমের দিনে ভালুকরা আরাম পায়। কিছু ভালুককে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে আনা হয়, আবার কাউকে লোহার খাঁচার ফাঁদে সিল মাছের মাংস দিয়ে প্রলুব্ধ করে ধরা হয়।
ম্যাকলিনের ধরা সেই ভালুককে জেলখানায় আনার পর এটির ওজন নেওয়া হয় এবং নাক থেকে লেজ পর্যন্ত মাপজোখ করা হয়। এরপর তার কানে একটি ট্যাগ পরিয়ে দেওয়ার পর তার মুখে একটি স্থায়ী ছাপ বা ট্যাটু করে দেওয়া হয়। এটা মূলত করা হয় যেন ভবিষ্যতে সহজেই তাকে চেনা যায়। জেলখানায় ভালুকদের কোনো খাবার দেওয়া হয় না। এর একটি বিশেষ কারণ আছে। বিজ্ঞানীরা চান না যে ভালুকরা মানুষের সংস্পর্শে এসে খাবারের আশা করুক। তারা মনে করেন, জেলখানার অভিজ্ঞতা যদি খুব একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর হয়, তবে ভালুকরা ভবিষ্যতে আর মানুষের কাছে আসতে চাইবে না। জেলখানায় তারা শুধু পানি বা খাওয়ার জন্য বরফ পায়। যেহেতু এই সময় প্রকৃতিতেও তারা উপোস থাকে, তাই জেলের ভেতরে খাবার না দেওয়া তাদের জন্য খুব বেশি কষ্টের হয় না। তারা শুধু খড় বা কাঠের গুঁড়োর ওপর শুয়ে থেকে দিন পার করে।
ভালুকদের এই বন্দিদশা স্থায়ী হয় সর্বোচ্চ ৩০ দিন অথবা হাডসন সাগরে বরফ না জমা পর্যন্ত। যখনই সাগরের পানি জমে বরফে পরিণত হয়, তখনই শুরু হয় তাদের মুক্তির উৎসব। এই দৃশ্য দেখতে শহরের অনেক মানুষ ভিড় করেন। খাঁচায় ভরে ভালুকদের সমুদ্রের ধারের বরফের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একে একে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেয়ে ভালুকগুলো মহানন্দে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে তাদের শিকারের সন্ধানে চলে যায়। ২০২২ সালে এমন ৫টি ভালুককে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সেই গুদাম ভাঙা অল্প বয়স্ক স্ত্রী ভালুকটিও তাদের একটি। সে এখন মুক্ত প্রকৃতির বুকে আবার সিল মাছ শিকার করে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে।
সূত্র : এটলাস অবসিকিউরা







