মেঘের ওপরের এই দালানে হয় বিয়ের আয়োজনও

সংগৃহীত ছবি
পাহাড়ের চূড়ায় একটি রাত কাটানো অনেক পর্বতারোহীর স্বপ্ন। সূর্যাস্তের রঙ বদলানো আকাশ আর ভোরের প্রথম আলোয় বরফে ঝলমল করা পাহাড় দেখা সত্যিই এক অন্যরকম অনুভূতি। ইউরোপে এমন অসংখ্য পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্র আছে, তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী হলো মার্গারিটা হাট।
মার্গারিটা হাট ইতালির আল্পস পর্বতমালার মন্ট রোসা ম্যাসিফ অঞ্চলে পুন্তা নিফেত্তি নামে একটি পাহাড়ের একদম চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে। জায়গাটি ইতালি ও সুইজারল্যান্ড সীমান্তের খুব কাছাকাছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৫৫৪ মিটার অর্থাৎ প্রায় ১৪ হাজার ৯৪১ ফুট। উচ্চতার দিক থেকে এটি শুধু আল্পস পাহাড়েরই নয়, বরং পুরো ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে থাকা দালান হিসেবে পরিচিত।
মার্গারিটা হাটের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৮৯৩ সালে এটি নির্মাণ করা হয় এবং ইতালির রানি মার্গারিটার নামে নামকরণ করা হয়। মজার বিষয় হলো, উদ্বোধনের সময় রানিকে একটি চেয়ারে বসিয়ে লোকজন দিয়ে কাঁধে করে এই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে ১৯৯০ সালে পুরনো কাঠামোটি বদলে নতুন একটি বড় কাঠের ভবন তৈরি করা হয়। এটি দেখতে অনেকটা দুই তলা কাঠের বাক্সের মতো। অবাক করা বিষয় হলো, এর কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই। বরং শক্ত স্টিলের তার দিয়ে পুরো ভবনটি পাহাড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে।
শুরুর দিকে এই ঘরটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল কিছুটা ভিন্ন। বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছিলেন অনেক উঁচুতে মানুষের শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তখন উচ্চতা জনিত বিভিন্ন রোগের গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। অনেক বিজ্ঞানী এখানে দিনের পর দিন থেকে গবেষণা করেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রয়োজনীয়তা বদলে যায়। বর্তমানে এটি সারা বিশ্বের পর্বতারোহীদের জন্য একটি জনপ্রিয় বিশ্রামস্থল। যারা কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এই উচ্চতায় ওঠেন, তারা এখানে এসে বিশ্রাম নেন। দীর্ঘ পথচলার পর এই ঘর যেন তাদের জন্য স্বস্তির জায়গা হয়ে ওঠে।
পাহাড়ের এত উঁচুতে এই ঘরে থাকার অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য সব জায়গা থেকে একদম আলাদা। পাহাড়ের চূড়ায় আবহাওয়া সব সময় একরকম থাকে না। প্রচণ্ড শীত আর তুষারপাতের কারণে এই ঘরটি বছরের সব সময় খোলা রাখা সম্ভব হয় না। সাধারণত জুন মাসের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শুরু পর্যন্ত যখন আবহাওয়া কিছুটা সহনীয় থাকে, তখন এটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। গ্রীষ্মকালীন এই সময়ে এখানে একসঙ্গে অন্তত ৭০ জন মানুষের থাকার ব্যবস্থা থাকে। তবে যারা অনেক বেশি সাহসী এবং শীতের তীব্রতা সহ্য করে পাহাড় জয় করতে চান তাদের জন্য শীতকালেও একটি বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শীতের সময় এই ঘরের একটি ছোট অংশ খোলা থাকে, যেখানে ১২টি বিছানা রয়েছে।
মার্গারিটা হাটের গঠনও বেশ অদ্ভুত। এটি অনেকটাই লম্বা উড়োজাহাজের শরীরের মতো, তবে প্রস্থ মাত্র তিন মিটার। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হবে পুরো ভবনটি যেন বরফের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এমন অবস্থায় মনে হয়, যদি তারগুলো ঠিকমতো বাঁধা না থাকে, তাহলে হয়তো এটি নিচে গড়িয়ে পড়বে।
এই জায়গার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখানে পৌঁছানো। বর্তমান সময়ে অনেক দুর্গম জায়গায় হেলিকপ্টারে যাওয়া গেলেও মার্গারিটা হাটে যাওয়ার কোনো নিয়মিত হেলিকপ্টার সুবিধা নেই। এখানে যেতে হলে একমাত্র উপায় হলো নিজের পায়ে হেঁটে ওঠা। আর এই পথটি মোটেই সহজ নয়। সাধারণত এখানে পৌঁছাতে অন্তত দুই দিন সময় লাগে। যারা যেতে চান, তাদের শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয় এবং পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও থাকতে হয়।
মজার বিষয় হলো, এই পাহাড় চূড়ায় এখন বিয়ের আয়োজনও করা যায়। ২০১৭ সাল থেকে আলানিয়া ভালসেসিয়া শহরের মেয়র এখানে নাগরিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন। তাই কেউ যদি চান মেঘের রাজ্যে চারদিক সাক্ষী রেখে জীবনসঙ্গীর হাত ধরবেন, তবে তিনি এখানে বিয়ের আয়োজন করতে পারেন। এর জন্য একটি অদ্ভুত শর্ত আছে। বর ও কনে থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত সব অতিথিকে দুদিন ধরে পাহাড় বেয়ে এই উচ্চতায় উঠে আসতে হবে।
মানুষের অদম্য সাহস আর প্রকৃতির অসীম সুন্দরের এক মিলনস্থল হলো এই মার্গারিটা হাট। যারা পাহাড়কে ভালোবাসেন এবং জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের কাছে মার্গারিটা হাট একটি স্বপ্নের নাম। মেঘের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িটি যুগের পর যুগ ধরে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হয়ে টিকে আছে।
সূত্র : অডিটি সেন্ট্রাল



