জলজ আবহে দেবী বন্দনা

বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে নির্মিত গুলশান–বনানী সার্বজনীন পূজা মণ্ডপ। ছবি: সংগৃহীত
ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও বাঙালির সংস্কৃতি—সবখানেই জলের উপস্থিতি অপরিহার্য। সেই জলকে কেন্দ্র করেই এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে ব্যতিক্রমী ভাবনা নিয়ে হাজির হচ্ছে গুলশান–বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন। ‘জলজ’ অর্থাৎ জল থেকে যার জন্ম—এই প্রতিপাদ্যে মণ্ডপসজ্জার মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হবে সৃষ্টি, জীবন, প্রকৃতি ও পরম শক্তির এক নান্দনিক মেলবন্ধন।
আধুনিক বিজ্ঞান জীবনের বিকাশে জলের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, প্রাচীন বৈদিক দর্শনেও জলকে সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থা নিয়ে যে দার্শনিক অনুসন্ধান রয়েছে, তাতে আদিম জলরাশির ধারণা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সনাতন ধর্মে জল কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নয়, পবিত্রতা ও শুদ্ধতারও প্রতীক। ঘটস্থাপন, তর্পণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে জলের উপস্থিতি অপরিহার্য। জলের গভীরতা থেকে যেমন পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশ ঘটে জীবনের নানা রূপে। আর সেই মহাশক্তিরই আরাধনা করা হয় মা দুর্গারূপে।
এই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে স্থাপত্য, প্রকৌশল, কুটিরশিল্প ও আলোকসজ্জার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে বৃহৎ জলজ জৈব-রূপকল্প। বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের মতো পরিবেশবান্ধব উপাদানে নির্মিত হবে ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট। জলপ্রপাত, প্রতিবিম্ব সৃষ্টিকারী জলাধার ও আলোর মেলবন্ধনে মণ্ডপে দেখা মিলবে জলের গতিময়তা ও গভীরতার আবহ। প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের অন্তঃস্থল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের পথচলা হবে উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে প্রশান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী অভিজ্ঞতা।
মণ্ডপের কেন্দ্রে থাকবে বৃহৎ পদ্মরূপী স্থাপত্য। জলের গভীরতা থেকে প্রস্ফুটিত পদ্মের প্রতীকী রূপকে কেন্দ্র করে সাজানো হবে দেবী দুর্গার অধিষ্ঠান।
‘জলজ’ কেবল ধর্মীয় ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাও। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের কারণে পৃথিবীর জলসম্পদ আজ সংকটের মুখে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য জল রক্ষা মানে জীবন, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা। তাই এই আয়োজন প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতার আহ্বান জানায়।
গুলশান–বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে নির্মিত হচ্ছে এই মণ্ডপ। স্থপতি অমিতি কুন্ডু ও শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহার পরিকল্পনা, নকশা ও তত্ত্বাবধানে সাজানো হয়েছে আয়োজনের সামগ্রিক ভাবনা। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত এই আয়োজনের প্রার্থনা—জীবন ও প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকুক, সংহার নয়, সৃষ্টির শক্তিতে সুন্দর হোক পৃথিবী।



