ওয়ান-ইলেভেন : কী ঘটেছিল সেইদিন

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তার মধ্যে 'ওয়ান-ইলেভেন' একটি অন্যতম ঘটনা। নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন- এই ইস্যুতে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়; ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে 'ওয়ান-ইলেভেন' হিসেবে পরিচিত।
আওয়ামী লীগসহ সমমনা দলগুলোর দাবি অনুযায়ী তখনকার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সে বছরের ১১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ২২ জানুয়ারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল সেটি বাতিল করেছিলেন। সূত্র ধরেই ক্ষমতায় এসেছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার প্রধান হয়েছিলেন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। আর তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ।
ওয়ান-ইলেভেন নামকরণ যেভাবে
২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির প্রাক্কালে সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমদ সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
মইন ইউ আহমদই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ওয়ান-ইলেভেন বা এক/এগারো (১/১১) নামে আখ্যায়িত করেন। জরুরি অবস্থা জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলেও বিভিন্নভাবে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে আন্দোলন রাজপথে নেমে আসে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক পর্যায়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে ঘরোয়া রাজনীতিরও অনুমতি দেয়।
যেমন ছিল সেদিন
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বিকেলে জরুরি অবস্থা জারির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। দিনভরই চারদিকে ছিল নানা গুজব, গুঞ্জন। সার্বিক পরিস্থিতি ছিল থমথমে। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিমানবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাব, বিডিআরসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে সেনা সদরে বৈঠক করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ।
রাত সাড়ে ৮টায় বঙ্গভবনে আবার ডাকা হয় উপদেষ্টাদের। সে সময় উপদেষ্টাদের সবাইকে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়। এরপর প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে উপদেষ্টারাও পদত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এরপর নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রাত সাড়ে ১১টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের কথা জানান।
জেনারেল মইন ইউ আহমেদের বইয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে। তিনি নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। কেন ওয়ান-ইলেভেন হয়েছিল তা ওই ঘটনার কুশীলব সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার লেখা ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘শান্তির স্বপ্নে’ বইতে কিছুটা তুলে ধরেছেন তিনি। রাজনীতিতে কোনোভাবেই সেনাবাহিনীকে জড়াতে চাননি, এ কথাও বারবার বইতে লিখেছেন সাবেক সেনাপ্রধান। এমনকি তিনি যখন ডিভিশন কমান্ডারদের দেশের অবস্থা বর্ণনা করতেন এবং তাদের মতামত শুনতে চাইতেন তখন তারাও দ্রুত কিছু করার তাগিদ দিতেন।
এ ক্ষেত্রে সাভারের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কথা বইতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। এক-এগারো পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারে সেনাবাহিনী সরাসরি না থাকলেও সবখানেই যে তাদের প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপ ছিল এ কথা সর্বজনবিদিত, যে কারণে দেশে-বিদেশে ওই সরকার ‘সেনা সমর্থিত সরকার’ বলেই পরিচিত।
জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার বইয়ে লিখেছেন, জাতিসংঘের একটি প্রচ্ছন্ন হুমকির কথা, যেখানে শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীর সীমিত আয়ের চাকরিতে সৈনিকদের একমাত্র অবলম্বন জাতিসংঘ মিশন। তাদের সামনে থেকে যদি সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে।
ড. ইউনূস পেয়েছিলেন প্রথম ফোন
সেসময়ের সেনাপ্রধান তার বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের মূল কাজ হয় প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি এমন একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজে বের করা।
তিনি বলেছেন, বঙ্গভবনেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তাদের দুটো নাম প্রস্তাব করেছিলেন, একজন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, অন্যজন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ। প্রফেসর ইউনূসকে প্রথম ফোনটি করেন তিনি। তবে প্রফেসর ইউনূস অস্বীকৃতি জানান। ড. ইউনূস বলেছিলেন, বাংলাদেশকে তিনি যেমন দেখতে চান সে রকম বাংলাদেশ গড়তে খণ্ডকালীন সময় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে আগ্রহী। সেই মুহূর্তে ড. ইউনূসের কথার মর্মার্থ বুঝিনি। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, তিনি একটি রাজনৈতিক দল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও পরিস্থিতির কারণে তাকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছিল।
এরপর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগানো হয় গভীর রাতে। প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার জন্য সময় চান তিনি। আধাঘণ্টা পর ফিরতি ফোনে সম্মতি জানান। ওই দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাবহুল দিন নাইন-ইলেভেনের মতো করে এক-এগারো হিসেবে অভিহিত করার সিদ্ধান্তও তারাই নিয়েছিলেন বলে বইতে লিখেছেন মইন ইউ আহমেদ। সেনাবাহিনীর ওই দিনের এ উদ্যোগ সে সময়ে দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। যদিও সেনাসমর্থিত ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরবর্তী দুই বছরের কর্মকাণ্ড পরে বেশ বিতর্কই সৃষ্টি করে। এর মধ্যে ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলা বলে পরিচিত প্রধান দুই দলের দুই নেত্রীকে অপসারণের একটি চেষ্টা নিয়ে এখনো দেশে সমালোচনা চলে।
গ্রেপ্তার খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা
ওয়ান-ইলেভেনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল দুই নেত্রীকে গ্রেপ্তার করা। জরুরি অবস্থা জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। গণতন্ত্রের চর্চা বন্ধ হয়ে যায় দেশে। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী ও বিএনপিপন্থী নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও গ্রেপ্তার হন সেনা নিয়ন্ত্রিত এই সরকার কর্তৃক। এবং এ সময়ই আলোচনার শীর্ষে চলে আসে মাইনাস টু ফর্মুলা।
ওয়ান-ইলেভেনের পর যখন দুই নেত্রীই কারাবন্দি, ঠিক তখনই প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এক কলাম লিখে বসেন, শিরোনাম ছিল- 'দুই নেত্রীকেই সরে দাঁড়াতে হবে।' এছাড়াও মাহফুজ আনামসহ আরো অনেকেই সমর্থন করেন বিষয়টি। রাজনৈতিক সংস্কার আনার প্রয়োজনে, সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য মাইনাস টু জরুরি বলে তারা মতামত দেন।
তারপর...
২০০৮ সালের শেষদিকে ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর আর দেশে ফিরেছেন বলে শোনা যায়নি। তিনি ওয়াশিংটনে থাকেন বলে দেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। জেনারেল মইন ইউ আহমেদও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হয়েছেন অবসর গ্রহণের পর।
















