তিন গুরুতর অনিয়মে ইউসিবি স্টকসহ কর্মকর্তাদের ৬৬ লাখ অর্থদণ্ড

সংগৃহীত ছবি
শেয়ারবাজারে তিনটি গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মেলায় বড় শাস্তির মুখে পড়েছেন ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডসহ প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিনিয়োগকারীর অগোচরে ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তন, ভুয়া পোর্টফোলিও বিবরণী প্রদান এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণে ব্যর্থতার মতো গুরুতর অভিযোগ তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রতিষ্ঠানটিসহ সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তার ওপর আরোপ করেছে ৬৬ লাখ টাকা জরিমানা।
ঘটনার সূত্রপাত একজন বিনিয়োগকারীর অভিযোগের মাধ্যমে। অভিযোগে বলা হয়, তার অনুমতি ছাড়াই ব্রোকারেজ হাউসটি তার মোবাইল নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য তথ্য যুক্ত করে। তদন্তে কমিশন এ অভিযোগের সত্যতা পায় এবং এটিকে সিকিউরিটিজ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে।
শুধু তথ্য পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ ছিল না অনিয়ম। বিনিয়োগকারীকে বিভ্রান্ত করতে তার নামে ভুয়া ও বানোয়াট পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট তৈরি করে সরবরাহ করা হয়। এর ফলে প্রকৃত বিনিয়োগ পরিস্থিতি আড়াল করা হয়, যা বিনিয়োগকারীর জন্য আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া আরও গুরুতর বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নথিপত্র গায়েবের ঘটনা। তদন্তে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব খোলার মূল ফরম যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি, এমনকি তা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই সেই নথিতে অসত্য তথ্য সংযোজনের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। এসব অপরাধের কারণে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশা, কর্মকর্তা মো. শহীদুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল আহাদ শেখকে পৃথকভাবে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়।
কমিশনের সিদ্ধান্ত
ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশা এবং কর্মকর্তা শহীদুজ্জামানকে ১৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম এবং কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ শেখকে ৩ লাখ টাকা করে জরিমানা গুনতে হবে।
বিনিয়োগকারীর যথাযথ অনুমোদন ব্যতিরেকে তার মোবাইল নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য মোবাইল নম্বর ও ইমেইল (যা বিনিয়োগকারীর নয়) অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর বিধি ১১ ও দ্বিতীয় তফসিলের আচরণ বিধি ১ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩-এর ধারা ১৮ লঙ্ঘন হয়েছে।
এই অপরাধে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ১০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশাকে ৫ লাখ, অফিসার মো. শহীদুজ্জামানকে ৫ লাখ এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও অফিসার আব্দুল আহাদ শেখকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীকে অসত্য ও বানোয়াট পোর্টফোলিও বিবরণী প্রদানের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৮ ও ২২ লঙ্ঘন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ১৮ এবং সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর বিধি ১১ ও দ্বিতীয় তফসিলের আচরণ বিধি ১ লঙ্ঘন হয়েছে।
এই অপরাধেও ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ১০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশাকে ৫ লাখ, অফিসার মো. শহীদুজ্জামানকে ৫ লাখ এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও অফিসার আব্দুল আহাদ শেখকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব খোলার ফরম সংরক্ষণ না করা তথা হারানো এবং বিষয়টি গোপন করে ও গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই বিও হিসাব ফরমে অসত্য তথ্যের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২০-এর রুল ৫(২)(ই); সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর বিধি ১১ ও দ্বিতীয় তফসিলের আচরণ বিধি ১: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ১৮ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৮ ও ২২ লঙ্ঘন হয়েছে।
একই অপরাধে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ১০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশাকে ৫ লাখ, অফিসার মো. শহীদুজ্জামানকে ৫ লাখ এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও অফিসার আব্দুল আহাদ শেখকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
বিএসইসি বলছে, বিনিয়োগকারীর তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি ব্রোকারেজ হাউসের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বে কোনো ধরনের অবহেলা বা ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা নষ্ট করে এবং সামগ্রিক বাজারব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এসব অনিয়ম সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত একাধিক আইন ও বিধিমালার লঙ্ঘন। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলসহ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অনিয়ম শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এ ধরনের ঘটনায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিএসইসির এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে অন্য ব্রোকারেজ হাউসগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

