ইরানের হামলা
ভয়ে ‘মাটির নিচে’ ইসরায়েল
- হুমকিতে শিক্ষার্থীদের জীবন
- চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে মাটির নিচে সুরক্ষিত স্থানে

ছবি: রয়টার্স
লেবাননে তেল আবিবের অব্যাহত হামলার জবাবে রবিবার রাতে ইসরায়েলে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তথ্য নিশ্চিত করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় গতকাল সোমবার ইসরায়েলের সব স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অনেক বাসিন্দা নির্দেশনামাফিক বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছেন। হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে মাটির নিচে সুরক্ষিত স্থানে। পরিবহন চলাচল, কেনাকাটা, অফিসের কাজ— সবকিছু চলছে সতর্কতা মেনে। জেরুজালেম পোস্ট ও টাইমস অব ইসরায়েল।
হামলার কথা স্বীকার করলেও হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি নেতানিয়াহু প্রশাসন। অন্যদিকে তেহরান বলছে, ইরানের এই অভিযান লেবাননের বিরুদ্ধে জায়নবাদী শাসনের চলমান আগ্রাসনের সরাসরি জবাব। ইরানের অভিযোগ, ইসরায়েল লেবাননে নিষিদ্ধ ফসফরাস বোমা ব্যবহার করেছে এবং আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা করে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল দাহিয়ায় অব্যাহত রেখেছে হামলা।
প্রতিশোধমূলক অভিযানের পরপরই ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড খাতামুল আম্বিয়া হেডকোয়ার্টার সতর্ক করে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর ও অনুতাপ সৃষ্টিকারী জবাব দেওয়া হবে।
এক বিবৃতিতে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিক লঙ্ঘন এবং লেবাননের জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বাড়ানোর জন্য দায়ী করেছে। একই সঙ্গে তেহরান দাবি করেছে, এ ধরনের হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ভূমিকা রাখছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি বা ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে আরও কঠোর ও ভয়াবহ হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান।
রবিবার রাতে, ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ঘোষণা করে, তারা ইরানের সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরপরই হোম ফ্রন্ট কমান্ড সারা দেশের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করে, যা সঙ্গে সঙ্গেই হয় কার্যকর।
নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মস্থলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো যাবে, যদি সতর্কবার্তার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয় (এই সময়সীমা অঞ্চলভেদে ভিন্ন)। প্রয়োজনে নিয়োগকর্তারা কর্মীদের বাড়ি বসেই কাজ করার নির্দেশও দিতে পারেন। তবে স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনগুলোকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধের গুঞ্জন শোনা যায়।
শিক্ষামন্ত্রী ইয়োভ কিশ ঘোষণা করেছেন, গতকাল সোমবার কোনো ক্লাস হবে না এবং কোনো ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশের স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে অভিভাবকদের আবারও হঠাৎ করেই এমন সমাধান খুঁজতে হচ্ছে, যাতে তারা একই সঙ্গে কাজও করতে পারেন এবং সন্তানদের দেখাশোনাও করতে পারেন। অ্যালোন সেন্টার ফর রিটার্নিং টু লাইফের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ডরন শাবতিতের ভাষ্য, স্কুল বন্ধ করে অর্থনীতি খোলা রাখা হয়েছে। মুখে চপেটাঘাতের অনুভূতির চেয়ে ভালো কিছু নেই এটিতে।
সাংবাদিক ও লেখক আমির টিবন কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘তারা যেভাবে আচরণ করছে তা লজ্জাজনক। সরকারের হাতে আগের ইরান-সংঘাত থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিলে শিক্ষাক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সময় ছিল দুই মাস। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। বরং আবারও সবচেয়ে সহজ পথ বেছে নিয়েছে। অভিভাবকদের ওপর বোঝা চাপানো এবং শিশুদের শাস্তি দেওয়া।
গত মার্চে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের শিক্ষা ও সংস্কৃতি কমিটির কাছে উপস্থাপিত স্টেট কম্পট্রোলারের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ৪০ শতাংশ ইসরায়েলি স্কুলে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার নেই। এসব স্কুলে প্রায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার শিক্ষার্থী পড়ে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রায় অর্ধেক কিন্ডারগার্টেন সম্পর্কেও ছিল না কোনো তথ্য।
গতকাল সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কিছু স্কুল কি দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে কার্যক্রম শুরু করবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কোনো পরিকল্পনা আছে কি না। তবে মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি।
ইরানের সঙ্গে আগের যুদ্ধে প্রথম কয়েক দিন স্কুল ও জরুরি নয় এমন কর্মস্থল— উভয়ই বন্ধ ছিল। যদিও কর্মীরা বাসা থেকে কাজ করতে পারতেন এবং কিছু স্কুল স্বতন্ত্রভাবে অনলাইন ক্লাস শুরু করেছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর কর্মস্থলগুলোকে স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে শর্ত ছিল থাকতে হবে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশের ব্যবস্থা।




