ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় চাপে ভারতের চাকরির বাজার

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করা ভারতীয় শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। ছবি : রয়টার্স
ইরান যুদ্ধ ও পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার প্রভাব এবার সরাসরি ভারতের চাকরির বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করা ভারতীয় শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে চামড়া, জুতো, পোশাক, কাচের সামগ্রীর মতো শ্রমনির্ভর শিল্পেও রফতানির চাহিদা কমছে। ফলে দেশে বেকারত্ব ও আর্থিক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে কাজ করে বহু ভারতীয় জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। পাশাপাশি জুতা, পোশাক, চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্পে বিদেশে রপ্তানির উপর নির্ভর করেই বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের জেরে সেই দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা এসেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভারতের অর্থনীতি এখনো প্রায় ৭ শতাংশ হারে বাড়লেও চাকরির বাজারে চাপ বাড়ছে। প্রতি বছর ৬০ থেকে ৭০ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু নতুন চাকরি তৈরি সেই হারে হচ্ছে না। বেতন বৃদ্ধিও কমে যাচ্ছে। এর ফলে সামাজিক অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের কানপুরের মতো শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। সেখানে বহু চামড়া কারখানা বিদেশে পণ্য পাঠায়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, গ্যাস, পরিবহণ ও জাহাজ খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদেশে চাহিদাও কমছে।
কানপুরের একটি চামড়া কারখানার মালিক তাজ আলম জানিয়েছেন, আগে তার কারখানায় ৫০০-র বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। এখন কারখানা অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে। কর্মী সংখ্যাও প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যৎ খুবই অনিশ্চিত।
চামড়া রফতানি পরিষদের সহ-সভাপতি মুখতারুল আমিন জানিয়েছেন, শুধু কানপুর থেকেই বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীরা নতুন নিয়োগ বা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। বিদেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয়ের মধ্যে প্রায় ৯০ লাখই উপসাগরীয় দেশে কাজ করেন।
কেরলেও একই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বহু বছর ধরে উপসাগরীয় দেশ থেকে আসা অর্থের উপর নির্ভর করে সেখানকার অর্থনীতি চলছে। সৌদি আরবে নির্মাণ সংস্থায় কাজ করা থমাস চেরিয়ান জানিয়েছেন, তার সংস্থা প্রায় ৬০০ ভারতীয় কর্মীকে ছাঁটাই করেছে। জুনের মধ্যে তিনি কাজে ফিরতে না পারলে তার ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যুদ্ধ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, দুর্বল বিশ্ব বাণিজ্য এবং কঠোর বিদেশি অভিবাসন নীতির কারণেও ভারতের কর্মসংস্থানের উপর চাপ বাড়ছে। উৎপাদন শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ সব ক্ষেত্রেই দিন দিন সংকট তৈরি হচ্ছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলে ভারতের বেকারত্বের হার বেড়ে ৫.২ শতাংশ হয়েছে। বহু শিক্ষিত তরুণ কম বেতনের অস্থায়ী বা অনিরাপদ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদ রাম সিংহ জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়া, রফতানিতে অনিশ্চয়তা এবং বাড়তি খরচের কারণে উৎপাদন, পরিবহণ ও বাণিজ্য নির্ভর ক্ষেত্রগুলোতে নতুন নিয়োগ আরও কমতে পারে।







