বিশ্বকাপ
বারবার নিজেকে বদলেছেন, হেঁটে হেঁটেই করেছেন বিশ্বজয়

সংগৃহীত ছবি
প্রথমবার অনুশীলনে দেখেই রোনালদিনিও বলেছিলেন, ‘সে একদিন সেরা হবে।’ ২০০৫ সালে জুভেন্তাসের বিপক্ষে ১৮ বছরের এক কিশোরের খেলা দেখে কোচ ফাবিও ক্যাপেলো এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ম্যাচ শেষেই তাকে দলে ভেড়াতে চেয়েছিলেন। ২১ বছর বয়সে যখন রোনালদিনিওর বিদায়ের পর বার্সেলোনার ব্যাটন তার হাতে উঠছে, তৎকালীন কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, ‘ওকে যত বেশি বল দেওয়া যায়, দলের জন্য তত ভালো।’
সেই ১৮ বছরের উইঙ্গার থেকে ৩৮ বছর বয়সে এসে আজ নিজের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। এই দুই দশকের ক্যারিয়ারে তিনি শুধু ট্রফি আর গোলের পাহাড়ই জমাননি, বরং বদলে দিয়েছেন আধুনিক ফুটবলের ব্যাকরণ। ফুটবল ইতিহাসের অনেকেই কিংবদন্তি হয়েছেন, কিন্তু ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে মেসির মতো এতবার নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন করে আবিষ্কার খুব কম খেলোয়াড়ই করতে পেরেছেন।
২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা যখন বার্সেলোনার দায়িত্ব নেন, মাঠের ডান প্রান্তটি ছিল মেসির। কিন্তু ২০০৯ সালের ২ মে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচে গার্দিওলা এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন। মেসিকে ডান উইং থেকে সরিয়ে নিয়ে এলেন আক্রমণের কেন্দ্রে, তবে প্রথাগত স্ট্রাইকার হিসেবে নয়। স্যামুয়েল ইতো গেলেন ডানে, থিয়েরি অঁরি বামে; আর মেসিকে বলা হলো- নিচে নামো, বল ধরো এবং সিদ্ধান্ত নাও। এভাবেই এলো বার্সেলোনার ৬-২ গোলের ঐতিহাসিক জয়। জন্ম হলো ফুটবল ইতিহাসের আধুনিক ‘ফলস নাইন’ ভূমিকার।২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মেসি লা লিগায় ৬৯ ম্যাচে ৯৬ গোল করেন। ২০০৯ সালে ২২ বছর বয়সে জেতা প্রথম ব্যালন ডি’অরটি পরবর্তীতে তার স্থায়ী সম্পত্তি হয়ে যায়, যার সর্বশেষটি তিনি উঁচিয়ে ধরেছেন ৩৬ বছর বয়সে। সব মিলিয়ে রেকর্ড ৮ বার।
২০১৫ সালে জাভি এবং তার তিন বছর পর ইনিয়েস্তা যখন বার্সেলোনা ছাড়লেন, মেসির ওপর দায়িত্ব এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। যে মাঝমাঠ এত দিন তার সুরক্ষাকবচ ছিল, তা হারিয়ে যাওয়ার পর মেসিকে একই সাথে জাভি-ইনিয়েস্তা এবং গোলদাতার ভূমিকা পালন করতে হচ্ছিল।
মেসি এবারও নিজেকে মানিয়ে নিলেন। গোলমেশিন থেকে তিনি হয়ে উঠলেন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার। গোল করার চেয়ে গোল করানোর পরিসংখ্যানে তিনি উজ্জ্বল হতে শুরু করলেন। বার্সায় নিজের শেষ মৌসুমে ৩০ গোলের পাশাপাশি ১১টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। পিএসজিতে গিয়ে প্রথম মৌসুমে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো গোলের (১১) চেয়ে অ্যাসিস্ট (১৫) বেশি করেন। এক আর্জেন্টাইন ফুটবল বিশ্লেষক তার এই রূপান্তরকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এভাবে, ‘একজন গোলমেশিন, যিনি সময়ের প্রয়োজনে ইনিয়েস্তা হয়ে উঠেছেন।’মাঠের এই কৌশলগত বিবর্তনের পাশাপাশি জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির গল্পটা ছিল চরম মানসিক লড়াইয়ের। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হওয়ার পর শুরু হয় ট্র্যাজেডি। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল- টানা তিন বছরে তিনটি ফাইনাল হেরে যখন দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা, তখন অভিমানে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি।
ফিরে এসে মেসি আর সেই শান্ত, চুপচাপ ছেলেটি হয়ে ছিলেন না। ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে বিতর্কিত হারের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে লাতিন ফুটবল কনফেডারেশনের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। বোঝা যায়, মেসি এখন কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করে বুক চিতিয়ে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় ছিল তার সেই অবদমিত যন্ত্রণার মুক্তি। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফি খরা কাটে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল মেসির রূপান্তরের এক চূড়ান্ত প্রদর্শনী। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে গভার্দিওলকে পেছনে ফেলে সেই ২০০৯ সালের উইঙ্গার মেসির দৌড় দেখা গেল, আবার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দেখা গেল মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা এক নিখুঁত ‘কোয়ার্টারব্যাক’ মেসিকে।
ইন্টার মায়ামি কিংবা ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় মেসিকে মাঠে দৌড়ানোর চেয়ে হাঁটতেই বেশি দেখা যায়। সমালোচকেরা একসময় এটাকে তার অলসতা বলতেন। কিন্তু এখন সেই হাঁটাকেই ফুটবল মায়েস্ত্রোর অনন্য দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়। শক্তি জমিয়ে রেখে ঠিক সঠিক মুহূর্তে তিনি প্রতিপক্ষকে আঘাত করেন। শৈশবের আইডল পাবলো আইমার একবার বলেছিলেন, ‘শেষের মেসিই সব সময়ের সেরা।’
বিশ্বকাপের আগে মেসিকে নিয়ে অনেক বিশেষণই খরচ হবে। তবে মেসি কতটা ভালো খেলোয়াড়, তার চেয়েও বড় বিস্ময় হলো, টিকে থাকার জন্য এবং দলকে জেতানোর জন্য গত ২০ বছরে তিনি কতবার নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে গড়েছেন!
-বিবিসি স্পোর্টস অবলম্বনে








