এশিয়ার ঘুমন্ত দানবদের উত্থান

প্রথমবার বিশ্বকাপে উজবেকিস্তান
সাধারণত মধ্য এশিয়ার দেশগুলো স্থলবেষ্টিত। সাগর-মহাসাগরের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এটি তাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। এ ছাড়া দেশগুলোর আছে আরেকটি বড় আক্ষেপ বিশ্বকাপ না খেলার। তবে এটি চিরতরে দূর হতে যাচ্ছে উজবেকিস্তানের হাত ধরে। ইতিহাসের প্রথম মধ্য এশিয়ার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে নীল গম্বুজের দেশটি।
২০২৫ সালের ৫ জুন উজবেকিস্তান ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে তারা। বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে ৬ জয়, ৩ ড্র ও মাত্র ১ হার নিয়ে গত সাতটি আসরের ব্যর্থতা কাটিয়ে অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে হোয়াইট উলভসরা। সঙ্গে সঙ্গে নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে একটি বাক্য –– ‘এশিয়ার ঘুমন্ত দানবদের উত্থান’।
ঘুমন্ত দানব বাক্যটি খুব ভালোভাবেই যায় উজবেকিস্তানের সঙ্গে। কত প্রতিভাবান খেলোয়াড় দেশটিতে, যেকোনো বড় দলকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু তারপরও বারবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়েছে। অবশেষে এবার তারা সফলতার মুখ দেখতে পেয়েছে।
সাফল্যের এই রাস্তাটা মোটেই সহজ ছিল না উজবেকিস্তানের জন্য। প্রতিবার হৃদয় ভঙ্গ হওয়ার পরও হাল ছাড়েনি মধ্য এশিয়ার এ দেশটি। তাদের এই ফিরে আসার পেছনে কৃতিত্ব সাবেক দুই কোচের–– স্রেচকো কাতালেৎস ও তৈমুর কাপাদজে। এই দুজন উজবেকিস্তানের হতাশাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন। স্রেচকোর হাত ধরেই দলটির ভিত মজবুত হয়েছিল এবং তিনি সরে যাওয়ার পর কাপাদজে আরও উন্নত পরিকল্পনা সাজান, যা বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাপাদজে দেশটির যুব দলকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যার ফলে অনেক তরুণ সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় তার হাত ধরে জাতীয় দলে উঠে এসেছেন।
উজবেকিস্তানের ফুটবলের এই উন্নতি কয়েকদিনের নয়, বরং লম্বা একটি পরিকল্পনার ফসল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর উজবেকিস্তান নিজস্ব ফুটবল দল গঠন করে। শুরু থেকেই দেশটির সরকারের লক্ষ্য ছিল ফুটবলের মাধ্যমে দেশটির পরিচিতি গড়ে তোলা।
২০১৯ সালে দেশটির সরকার ‘Concept for the Development of Football until 2030’ নামে একটি বাধ্যতামূলক রোডম্যাপ তৈরি করে। সারা দেশে একাডেমি সম্প্রসারণ, ভিএআর চালু করা, জাতীয় দলের সব বয়সভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন এবং একটি জাতীয় স্কাউটিং ও উন্নয়ন ব্যবস্থা তৈরি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি শুধু কাগুজে পরিকল্পনা ছিল না, ফেডারেশন থেকে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়।
তরুণ ফুটবলার তৈরি করার জন্য ২০১৮ সাল থেকে সরকার সারা দেশের ১৪টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ফুটবল একাডেমি খুলেছে। এ ছাড়া অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশটির ফুটবল কাঠামোর অবিশ্বাস্য উন্নতি হয়েছে। উজবেকিস্তান ফুটবল ফেডারেশন বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে, বিশেষত রিয়াল মাদ্রিদ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অংশীদারত্ব করে ‘স্প্যানিশ মেথড’ গ্রহণ করেছে।
ফুটবল উজবেকিস্তানের মানুষের রক্তে মিশে আছে। তাদের ফুটবল আসক্তি অন্য যেকোনো বড় দেশকে হার মানাবে। বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করায় তা পৌঁছে গিয়েছে এক অন্য উচ্চতায়।






