যেসব আমল হজকে কবুলযোগ্য করে

হজ এমন এক মহান ইবাদত, যা মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে। এটি শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক কাজের সমষ্টি নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ধৈর্য, আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও ইমানের গভীর পরীক্ষার নাম। তাই প্রত্যেক হাজির অন্তরে একটি প্রশ্ন জাগে, আমার হজ কি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে? কারণ হজের প্রকৃত সফলতা শুধু হজ পালন করায় নয়, বরং তা ‘হজ্জে মাবরুর’ বা কবুল হজে পরিণত হওয়ায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৭৩)
হজ কবুল হওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও গুণ রয়েছে, যেগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে হজের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হিসেবে তাকওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা আল-বাকারা আয়াত : ১৯৭)
হজের সফরে মানুষ ঘর-বাড়ি, পরিবার ও আরামের জীবন ছেড়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়। কিন্তু বাহ্যিক সফরের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের সফর। তাকওয়া ছাড়া হজ শুধু শারীরিক পরিশ্রমে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) তার লাতায়িফুল মা‘আরিফ গ্রন্থে বলেছেন, ‘হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অন্তরকে আল্লাহমুখী করা এবং পাপমুক্ত জীবনের দিকে ফিরে আসা।’
হজ কবুল হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম সম্পদ দ্বারা হজে গেলে বাহ্যিকভাবে ফরজ আদায় হয়ে গেলেও তার কবুল হওয়ার আশা থাকে না বললেই চলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলতেন, ‘হজে হাজার দিরহাম ব্যয় করার চেয়ে একটি হারাম দিরহাম বর্জন করা অধিক উত্তম।’ কারণ হারাম খাদ্য ও সম্পদ মানুষের দোয়া ও ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
হজকে কবুলযোগ্য করার অন্যতম আমল হলো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং চরিত্রকে সুন্দর করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেন, ‘হজে অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ নেই।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯৭)
হজে লাখো মানুষের ভিড়ে ধৈর্য, সহনশীলতা ও উত্তম আচরণই একজন হাজির প্রকৃত পরিচয় বহন করে। কেউ ধাক্কা দিল, কষ্ট দিল কিংবা অবিচার করল, তবুও ধৈর্য ধারণ করা হজের সৌন্দর্য। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীনের ‘আসরারুল হজ’ অংশে হজকে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, বিনয় ও নফসের পরিশুদ্ধির এক মহান প্রশিক্ষণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
হজ কবুল হওয়ার জন্য ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অপরিহার্য। মানুষকে দেখানো, সামাজিক মর্যাদা অর্জন কিংবা ‘হাজি’ উপাধি পাওয়ার মানসিকতা হজের রুহ নষ্ট করে দেয়। আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘তাদেরকে এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫)
হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘কবুল হজের আলামত হলো, মানুষ হজ থেকে ফিরে এসে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হয় এবং আখিরাতমুখী হয়ে যায়।’
হজের সময় বেশি বেশি জিকির, দোয়া ও তাওবা করাও কবুলিয়াতের বড় মাধ্যম। আরাফার ময়দান বিশেষভাবে দোয়া কবুলের স্থান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৮৫)
হজের প্রতিটি ধাপে তালবিয়া, তাসবিহ, তাহলিল ও ইস্তিগফার মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। বিশেষ করে নিজের অতীত গুনাহ স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত তাওবা করা হজের প্রাণ।
মানুষের হক আদায় করাও হজ কবুল হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, কারও প্রতি জুলুম করা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করে হজে গেলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় থেকে যায়। অনেক সালাফ হজে যাওয়ার আগে মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতেন এবং ঋণ পরিশোধ করে যেতেন। কারণ আল্লাহর হক তিনি ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক সংশ্লিষ্ট বান্দা ক্ষমা না করলে মুক্তি কঠিন।
হজের পরে জীবনে পরিবর্তন আসাও কবুল হজের একটি বড় আলামত। হজ শেষে যদি মানুষ আবার আগের গুনাহে ফিরে যায়, তাহলে বুঝতে হবে হজ তার অন্তরে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিশিষ্ট তাফসিরকার ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘হজ্জে মাবরুর সেই হজ, যার পরে বান্দার জীবন পাপ থেকে নেকির দিকে পরিবর্তিত হয়।’
আজকের যুগে অনেক সময় হজও সামাজিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। বিলাসিতা, ছবি তোলা, অহংকার ও দুনিয়াবি প্রতিযোগিতা হজের আধ্যাত্মিকতা নষ্ট করে দেয়। অথচ হজের শিক্ষা হলো বিনয়, কান্না, আত্মসমর্পণ ও মৃত্যুর স্মরণ। ইহরামের সাদা কাপড় মানুষকে কাফনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর আরাফার ময়দান মনে করিয়ে দেয় কিয়ামতের ময়দানের কথা, যেখানে ধন-সম্পদ বা পরিচয় নয়, কেবল আমলই মানুষের মুক্তির কারণ হবে।
তাই হজকে কবুলযোগ্য করতে হলে প্রয়োজন বিশুদ্ধ আকিদা, হালাল উপার্জন, ইখলাস, তাকওয়া, ধৈর্য, উত্তম চরিত্র, বেশি বেশি জিকির ও তাওবা এবং হজের পর নতুন জীবন শুরু করার দৃঢ় সংকল্প। যে হজ মানুষকে বদলে দেয়, আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে এবং গুনাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেটিই প্রকৃত হজ্জে মাবরুর। আর সেই হজের পুরস্কার আল্লাহর রাসুল (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন, ‘তার প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






