কোরআনের আয়নায় মানুষের দ্বিমুখী চরিত্র
- বিপদ মুক্তির পর কেন বদলে যায় মানুষ

কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ৩২
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ اِذَا غَشِیَهُمۡ مَّوۡجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللّٰهَ مُخۡلِصِیۡنَ لَهُ الدِّیۡنَ ۬ۚ فَلَمَّا نَجّٰهُمۡ اِلَی الۡبَرِّ فَمِنۡهُمۡ مُّقۡتَصِدٌ ؕ وَ مَا یَجۡحَدُ بِاٰیٰتِنَاۤ اِلَّا كُلُّ خَتَّارٍ كَفُوۡرٍ ﴿۳۲﴾
৩২. আর যখন তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ছায়ার মতো, তখন তারা আল্লাহকে ডাকে তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌছান। তখন তাদের কেউ কেউ মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে; আর শুধু বিশ্বাসঘাতক, কাফির ব্যক্তিই আমাদের নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এ আয়াতটিতে মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাব, বিপদের সময় তার অসহায়ত্ব এবং নিরাপদ অবস্থায় ফিরে গিয়ে অনেকের অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ার চিত্র অত্যন্ত জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন।
যখন সমুদ্রের বিশাল ঢেউ ছায়ার মতো তাদেরকে ঘিরে ফেলে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। কারণ তখন তারা বুঝতে পারে, মানুষ, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা প্রযুক্তি কিছুই তাদের রক্ষা করতে পারবে না। মৃত্যুভয় মানুষের অন্তরের আসল সত্যকে প্রকাশ করে দেয়। তাই বিপদের মুহূর্তে এমনকি মুশরিকরাও আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়।
পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় এই মানবিক বাস্তবতার কথা এসেছে। যেমন— ‘তারা যখন নৌকায় আরোহণ করে, তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। কিন্তু তিনি যখন তাদেরকে স্থলে পৌঁছে দেন, তখনই তারা শিরকে লিপ্ত হয়।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৬৫)
আয়াতে ‘তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ছায়ার মতো’ কথাটি গভীর অলংকারপূর্ণ। সমুদ্রের উঁচু ঢেউ দূর থেকে যেন পাহাড় বা বিশাল কালো ছায়ার মতো মনে হয়। ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এখানে মানুষের ভয়াবহ অসহায় অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। যখন চারদিক মৃত্যু-আশঙ্কায় ঢেকে যায়, তখন অন্তরের ভেতরের ফিতরাত বা স্বাভাবিক ঈমান জেগে ওঠে।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘তখন তাদের কেউ কেউ মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।’ এখানে আয়াতে ‘মুক্তাসিদ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ কয়েকটি মতামত দিয়েছেন:
১. কেউ কেউ বিপদের পরও ঈমান ও
কৃতজ্ঞতার ওপর স্থির থাকে।
২. কেউ পুরোপুরি কুফরিতে ফিরে যায় না, আবার পূর্ণ আনুগত্যেও আসে না। এক
ধরনের দ্বিধাগ্রস্ত ও মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে।
৩. কেউ আল্লাহকে স্বীকার করে, কিন্তু জীবনের সব ক্ষেত্রে তাঁর বিধান মানে না।
ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এখানে মানুষের সেই স্বভাবের কথা বলা হয়েছে, যারা বিপদের সময় খুব আন্তরিক হয়; কিন্তু নিরাপদ হলে সেই আন্তরিকতা হারিয়ে ফেলে।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘আর শুধু বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।’ এখানে দুটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
খাত্তার (خَتَّارٍ) : চরম বিশ্বাসঘাতক। যে আল্লাহর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলে। বিপদে বলে ‘আল্লাহ বাঁচালে আমি বদলে যাব’। কিন্তু উদ্ধার পাওয়ার পর আবার গুনাহ ও অবাধ্যতায় ফিরে যায়।
কাফুর (كَفُورٍ) : অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি। যে আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করে, কিন্তু তাঁর আনুগত্য করে না।
এই আয়াত শুধু সমুদ্রযাত্রার কোনো ঘটনা নয়; বরং পুরো মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি। মানুষ অসুস্থ হলে, দুর্ঘটনায় পড়লে, যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হলে বা মৃত্যুভয় সামনে এলে আল্লাহকে খুব করে স্মরণ করে। কিন্তু বিপদ কেটে গেলে আবার গাফেল হয়ে যায়। কুরআন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে শুধু বিপদে নয়, নিরাপদ সময়েও আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকে।
হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, ‘মুমিন ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করে এবং নেয়ামতের সময় কৃতজ্ঞ থাকে। আর মুনাফিক বিপদে চিৎকার করে, নিরাপদ হলে গাফেল হয়ে যায়।’
এ আয়াত আমাদের শেখায় যে, মানুষের অন্তরের গভীরে আল্লাহর অস্তিত্বের স্বীকৃতি লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই স্বীকৃতিকে স্থায়ী ঈমান ও আনুগত্যে রূপান্তর করাই প্রকৃত সফলতা।






