মাসুদ রানা ৬০ নটআউট

অনেক বছর আগে ফিরে যাই। আব্বুর চাকরিসূত্রে তখন থাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। যে বাসায় থাকতাম, এর কয়েকটা বাসা পরে নোমান ভাইদের বাসা। তারা চার ভাইবোন বইয়ের পোকা। বাসায় ট্রাঙ্কভর্তি বই। তাই নোমান ভাইদের বাসার প্রতি একটা আলাদা আগ্রহ ছিল আমাদের। আমি তখন তিন গোয়েন্দা, ওয়েস্টার্ন-কুয়াশার পালা শেষ করে মাসুদ রানায় মজেছি। চিরতরুণ এই নায়কের সাহস আর দেশপ্রেম— দুটোতেই মুগ্ধ। একদিন নোমান ভাইদের বাসার সামনে এক বন্ধুসহ গল্প হচ্ছে নোমান ভাইয়ের সঙ্গে। বললেন, ‘একটা গোপন খবর পাইছি।’ তারপর গলাটা আরও খাটো করে, ‘ঢাকার মতিঝিলে নাকি আসলেই বিসিআই, মানে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের অফিস আছে। আর ওই অফিসের চিফ কাজী আনোয়ার হোসেন।’
তখন মাসুদ রানা বলতে আমরা এতটাই অজ্ঞান ছিলাম, নোমান ভাইয়ের গালগপ্পো বলার অভ্যাস আছে জানার পরও বেমালুম বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম কথাটা। এর মূল কারণ অন্ধ রানাপ্রেম।
পরে তার এই কথা কেন বিশ্বাস করেছিলাম, ভেবে মনে মনে কম হাসিনি। তবে নিজে সেবায় লেখালেখি শুরুর পর মাসুদ রানা সম্পর্কে বিস্ময়কর নানা তথ্যই পেয়েছি। কোনোটা স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে, কোনোটা শেখ আবদুল হাকিমের কাছ থেকে, কোনোটা আবার কাজী শাহনূর হোসেন কিংবা সেবার অন্য কোনো লেখক বা বিদগ্ধ পাঠকের সৌজন্যে।
মাসুদ রানার জন্মটা কীভাবে, সেটা হয়তো অনেক পাঠকের জানা। তবে মাসুদ রানার জন্মদিনে লেখায় সে গল্পটা না থাকাটা অন্যায়। স্বয়ং কাজীদার সূত্রেই এটা জানা।
১৯৬৫ সালের গোড়ার দিক। এক বন্ধুর পীড়াপীড়িতে শিকারপাগল ভদ্রলোক মাহবুব আমিনের সঙ্গে দেখা করতে যান কাজী আনোয়ার হোসেন। জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) পশ্চিম পাকিস্তানের রেডিও প্রস্তুতকারক আরজিএ কোম্পানির সেলস ম্যানেজার ছিলেন তিনি। কাজীদার হোন্ডা ফিফটিতে চেপে দুজন হাজির হন তার অফিসে। প্রথম দেখাতেই জমে যায় সম্পর্ক। এরপর প্রায় প্রতিদিনই চলতে থাকে আড্ডা আর যাওয়া-আসা।
তখন কাজীদা বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে ‘কুয়াশা’ সিরিজের তিনটি বই লিখে চতুর্থটিতে হাত দিয়েছেন। বইগুলো পড়ে মাহবুব আমিন বললেন, ‘ভালোই হয়েছে। তবে বোঝা গেল, দুনিয়ার প্রথম সারির থ্রিলার-সাহিত্য সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই।’ এরপর তিনি উপহার দিলেন ‘ডক্টর নো’।
তারপর কী হয়েছিল, শুনি কাজী আনোয়ার হোসেনের জবানিতে—
“জীবনে ওই প্রথম প্রথম শ্রেণির স্পাই থ্রিলারের সংস্পর্শে এসে উপলব্ধি করেছিলাম বাংলা সাহিত্যে থ্রিলার রচনায় আমাদের সত্যিকার দুঃখজনক অবস্থান। সে সময় আমার জ্ঞানের দৌড় ছিল তৎকালীন ভারতীয় গোয়েন্দা কাহিনি এবং বড়জোর এক-আধটা আগাথা ক্রিস্টি পর্যন্ত।
এই মাহবুব আমিনেরই অনুপ্রেরণায় হাত দিলাম মাসুদ রানার প্রথম কাহিনি ‘ধ্বংস-পাহাড়ে’। জেমস বন্ডে প্রভাবিত না হয়ে উপায় ছিল না। কিন্তু ওই চরিত্রটি ষোলো আনাই ইংরেজ, হুবহু অনুকরণ করা যায় না। লাইসেন্সপ্রাপ্ত কিলারের কনসেপ্টও আমার ভালো লাগেনি; তাই ধরনটা মোটামুটি ঠিক রেখে তৈরি করলাম এক বাঙালি নায়কের চরিত্র।”
কিন্তু নামটি কীভাবে এলো?
কাজী আনোয়ার হোসেনের ভাষায়, “লেখার আগেই নামটা স্থির করে নিয়েছিলাম আমার গৃহিণীর সঙ্গে আলাপ করে। তিনি তখন ফুটফুটে সুন্দর মিষ্টি এক তরুণী: প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ফরিদা ইয়াসমিন। আমাদের দুজনেরই বন্ধু স্বনামধন্য গীতিকার মাসুদ করিমের ‘মাসুদ’ আর আমার ছেলেবেলার হিরো ইতিহাসে পড়া মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংহ থেকে ‘রানা’ নিয়ে নাম হলো মাসুদ রানা।”
কাজীদা নিজেই বলেছেন, ‘ধ্বংস-পাহাড়’-এর জন্ম ঢাকার সেগুনবাগিচার কাজী মঞ্জিলের দোতলায় বসে। কাজী মোতাহার হোসেনের সেই বাড়িতেই, যেখানে তার নিজেরও জন্ম। বইটি লিখতে সময় লেগেছিল আট-নয় মাস।
গল্পের পটভূমি ছিল কাপ্তাই বাঁধ। তাই প্লটের খোঁজে তিনি ঘুরে দেখেছেন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কাপ্তাই, কক্সবাজার। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই ১৯৬৬ সালের মে মাসে বের হয় মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই ‘ধ্বংস-পাহাড়’। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। কাজী আনোয়ার হোসেন হয়তো তার আরেক জনপ্রিয় চরিত্র ‘কুয়াশা’কে দিয়ে অমরত্বের ফর্মুলা খুঁজছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেই পাঠকের কাছে অমর করে দিয়েছে মাসুদ রানা।
এবার অন্য প্রসঙ্গ। এক আড্ডায় হাকিম আঙ্কেল, অর্থাৎ শেখ আবদুল হাকিমের কাছে শুনেছিলাম, একসময় মাসুদ রানা সিরিজ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কারণ, শুরুর কয়েকটি বই মৌলিক হলেও পরের অনেক বই-ই ছিল বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে। তখন তো অনলাইন যুগ নয়, বিদেশি থ্রিলার বা স্পাই বই জোগাড় করাই ছিল কঠিন। একপর্যায়ে রানার উপযোগী নতুন কোনো স্পাই থ্রিলার বা গা-ছমছমে রোমাঞ্চ কাহিনি আর পাওয়া যাচ্ছিল না।
সে অবস্থায় কাজী আনোয়ার হোসেন সেবার অন্য লেখকদের নিয়ে বসলেন। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো, রানাকে এবার প্রচলিত স্পাই থ্রিলারের বাইরে আনা হবে। ফলাফল—তিন খণ্ডের ‘বিদায় রানা’। ধীরগতির হলেও একেবারে ভিন্ন স্বাদের সেই অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিতেও পাঠক সাদরে গ্রহণ করে মাসুদ রানাকে।
কাজীদার কাছেও পরে মাসুদ রানাকে আগাগোড়া স্পাই থ্রিলার থেকে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির দিকে নিয়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরটা দিয়েছিলেন একটু অন্যভাবে, ‘ইয়ান ফ্লেমিং-এর জেমস বন্ডের আদলে স্পাই থ্রিলার দিয়ে শুরু করেছিলাম, তা ঠিক। তারপর আরও অনেক ধরনের লেখার সঙ্গে পরিচয় হলো, সেসবও কম আকর্ষণীয় নয়। একেকজনের লেখায় একেক রকম মজা, একেক বৈশিষ্ট্য। একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিষয়বৈচিত্র্য খুঁজবে। এক মাসুদ রানাতেই দেখুন না, স্পাই থ্রিলার, গোয়েন্দা উপন্যাস, আধিভৌতিক চিলার, সায়েন্স ফিকশন, পিওর অ্যাডভেঞ্চার। যেদিকে মন গেছে, সেদিকেই চলেছি। মৌমাছির মতো এ-ফুল ও-ফুল ঘুরে মধু সংগ্রহ করে আমরা মৌচাক বেঁধেছি সেবা প্রকাশনীতে। অনেক মৌমাছির পরিশ্রমের সমষ্টি নিয়ে আমাদের এই বাসা…।’
মজার আরেকটি গল্প আছে ‘অগ্নিপুরুষ’ নিয়ে। এ জে কুইনালের (A. J. Quinnell) বিখ্যাত উপন্যাস ‘ম্যান অন ফায়ার’ হুমায়ূন আহমেদকে দিয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন অনুবাদের জন্য। হুমায়ূন আহমেদ বইটি তার মতো করে এক ধরনের ভাবানুবাদ করলেন। ভাষা তার ধাঁচে অসাধারণ, কিন্তু সমস্যা হলো খুব সংক্ষিপ্ত করে ফেলেছিলেন তিনি কাহিনি। বিষয়টা কাজীদার ঠিক মনঃপূত হলো না। তিনি চাইলেন, ম্যান অন ফায়ার নিয়ে মাসুদ রানা করতে। কিন্তু ঝামেলা হলো রানাকে এরকম আনফিট, থলথলে একজন বডিগার্ডের চরিত্রে খাপ খাওয়ানো মুশকিল।
সেবায় তখন দুর্দান্ত সব লেখকের মেলা। তাদের কেউ কেউ ঘোস্ট রাইটার হিসেবে মাসুদ রানাও লেখেন। কাজীদা ঘোষণা দিলেন, রানাকে এই চরিত্রে খাপ খাওয়ানোর তরিকা বের করতে পারবেন, তিনি হবেন বইটির ঘোস্ট রাইটার। সেটা বের করলেন নিয়াজ মোরশেদ। তবে তিনি বললেন, এটা শেখ আবদুল হাকিম লিখলেই ভালো। ব্যস, শেখ আবদুল হাকিমের লেখা আর কাজী আনোয়ার হোসেনের অসাধারণ সম্পাদনায় জন্ম নিল মাসুদ রানা সিরিজের অন্যরকম বই অগ্নিপুরুষের। আচ্ছা, নিয়াজ মোরশেদ মাসুদ রানাকে ওই চরিত্রে খাপ খাওয়ানোর কী বুদ্ধি বের করেছিলেন? সেটা বইটি যারা পড়েছেন, তাদের জানা।
মাসুদ রানার কয়েকটি বই হোয়াইট প্রিন্টে বের হয়েছিল। না, নব্বই দশকে বের হওয়া কিশোর সংস্করণের কথা বলছি না। ঘটনাটা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরের। তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা দেয়, চারটি দৈনিক পত্রিকা ছাড়া আর কেউ সরকারি মিলের নিউজপ্রিন্ট ব্যবহার করতে পারবে না। সেবার বই ছাপাই বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তখন বাধ্য হয়ে মাসুদ রানার তিনটি বই— প্রমাণ কই, এখনো ষড়যন্ত্র এবং গুপ্তহত্যা বের হয় হোয়াইট প্রিন্টে। পরে অবশ্য বিধিনিষেধ উঠে গেলে একই মলাটে নিউজপ্রিন্টেও করা হয়।
কাজী আনোয়ার হোসেন কখনো রানার ঘোস্ট রাইটারদের অবদানের বিষয়টি অস্বীকার করেননি। মাসুদ রানার সবচেয়ে বিখ্যাত ঘোস্ট রাইটার নিঃসন্দেহে শেখ আবদুল হাকিম। অনেকেরই জানা নেই, জাল বইটির মাধ্যমে এই নামি লেখকের মাসুদ রানার জগতে প্রত্যাবর্তন। রানার আরেক ডাকসাইটে ছায়া লেখক শাহাদাৎ চৌধুরী। তার লেখা বইগুলোতে রোমাঞ্চের পাশাপাশি ছিল রোমান্সেরও ছড়াছড়ি। আক্ষরিক অর্থেই যাকে বলে, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শাহাদাৎ চৌধুরীকে আটকে রাখা ছিল রীতিমতো কঠিন। মাসুদ রানার ঘোস্ট লেখকদের মধ্যে আরও আছে রকিব হাসান, নিয়াজ মোরশেদ, সাজ্জাদ কাদির, ইফতেখার আমিন থেকে শুরু করে পরের দিকে ইসমাইল আরমান, কাজী মায়মুর হোসেন, কাজী শাহনূর হোসেনেরা।
মাসুদ রানার ভক্তরা শেখ আবদুল হাকিম, শাহাদাৎ চৌধুরীদের নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিয়ে মনে রাখবে। তবে রানার স্রষ্টা একজনই— তিনি কাজী আনোয়ার হোসেন।
আবার শুরুর জায়গাতে ফিরে আসছি। কাজী আনোয়ার হোসেন সত্যি বিসিআই চিফ নন; এটি বহু আগেই বুঝে গিয়েছিলাম। তবে যতবার সেবার নতুন দালানের তিনতলায় কাজী আনোয়ার হোসেনের রুমে গিয়েছি, মনে হয়েছে সামনের লোকটি রাহাত খান।
আর মাসুদ রানা… বিস্মরণে মাসুদ রানা মারা গিয়েছে মনে করে ভিলেন বিসিআই এজেন্টরা ক্যান্ডির মাস্তান রঘুনাথের গোটা সাম্রাজ্য ধসিয়ে দেয়। ওই দলটির নেতৃত্ব দেওয়া হাতকাটা এক যুবকের কথা বলে। তখন মনের ভেতর আবেগ উথলে ওঠে। সত্যি বলতে, শুধু মাসুদ রানা নয়; সিরিজের সঙ্গে জড়িত আরও কত চরিত্র— রাহাত খান, সোহেল, সোহানা, সলীল, গিল্টি মিয়া, রূপা এমনকি ভিলেন কবীর চৌধুরী, উ সেনের মতো চরিত্র আমাদের কাছে জীবন্ত। তারা মাসুদ রানার সঙ্গে আমাদের কাছে বাস্তবের চরিত্রই হয়ে উঠেছে। তাই কাজী আনোয়ার হোসেন এবং তার মাসুদ রানা সিরিজ বাংলাদেশের পাঠকের বুকের ভেতর থাকবে আরও বহু শত বছর।










