চরের মানুষের বন্ধু স্বপন
- ছোট থেকে চরের মানুষের দুঃখকষ্টের সঙ্গে পরিচিত। নদীভাঙনের শিকার হয়ে আজ এই চরে, কাল অন্য চরে বসতি গড়ে তোলেন তারা। তাদের দুঃখ লাঘবে কাজ করছেন স্বপন কুমার সরকার। তাকে নিয়ে লিখেছেন আবদুল্লাহ্ আল মামুন অন্তর

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার গ্রাম পুটিকাটার ছেলে স্বপন কুমার সরকার। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই প্রান্তিক মানুষের জীবন, তাদের বঞ্চনা ও সংগ্রাম তাকে ভাবিয়েছে। মাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকেই লেখালেখি ও সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। শিশু সাংবাদিকতা প্ল্যাটফর্ম ‘হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু। এখানে কাজ করতে গিয়ে প্রান্তিক শিশুদের কণ্ঠস্বর ও নিজের চিন্তাকে তুলে ধরার সুযোগ পান। পরে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নে লন্ডনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘চাইল্ড মেসেজ’-এর বাংলা বিভাগের ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেটরের দায়িত্ব পেয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেন। বুঝতে পারেন, সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়, বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম।
স্কুলে পড়াকালীন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জানতে চেষ্টা করছিলেন। সে সময়ে হঠাৎ শুনতে পান, তার উপজেলার চর গতিয়াসাম তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুদের নিয়ে সেই এলাকা পরিদর্শনে যান এবং সেখানকার মানুষের আর্তনাদ তাকে ভাবিয়ে তোলে। একজন বাবার বয়সী লোকের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করেন এবং তিনি কথা বলার একপর্যায়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। তাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকচাপা কথাগুলো বললেন। তিনি আর ঠিক থাকতে পারেননি। আবেগ ও চিন্তার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরিতে নেমে পড়েন। এই কাজের সূত্র ধরেই ঘুরে দেখেন কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চরাঞ্চল। নদীভাঙনে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায় একটি পরিবারের বহু বছরের চেষ্টায় গড়ে ওঠা বসতভিটা। বন্যা ও দুর্যোগের কারণে মানুষকে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়। একটি পরিবার আজ এক চরে, কাল অন্য চরে- এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাদের জীবনযাপন।
স্বপনের চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে চরের মানুষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি, যেমন লোকায়ত জ্ঞান, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের দিক থেকেও বঞ্চনার শিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সময়-অসময়ে নদীভাঙন, বন্যা ও নানা দুর্যোগের ফলে বারবার তারা স্থানচ্যুত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোজিত জীবনধারা, লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই বাস্তবতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন চরের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। তৈরি করেন ‘নয়া চর, নয়া ব্র্যান্ডিং’ পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে সমমনা কিছু তরুণকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘জাস্টিস ফর চর অ্যান্ড লোকাল রিসার্চ (জেএফসিএলআর)’ নামে একটি চর অ্যাডভোকেসি ও গবেষণাভিত্তিক সংগঠন। এই সংগঠনের লক্ষ্য- চরাঞ্চলের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণা এবং টেকসই উন্নয়নের পথ খুঁজে বের করা। তাদের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলো দেশের প্রথম ‘চর জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা। কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছি ইউনিয়নের গারুহারা বাজারে একটি ছোট টিনের ঘরে গড়ে ওঠা এই জাদুঘর আজ চরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিত। সীমিত সম্পদ, কিন্তু অসীম স্বপ্ন- এই বিশ্বাস থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগের। এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে চরবাসীর ব্যবহার্য অভিযোজিত সামগ্রী যেমন, ব্যবহৃত মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কাঁসার বাসন, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পুরনো মুদ্রা, কৃষিপণ্য, নদীর নানা নমুনা এবং বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্রসহ বিভিন্ন নিদর্শন। প্রতিটি নিদর্শন যেন গল্প বলে সংগ্রামের, অভিযোজনের এবং টিকে থাকার। এই সংগ্রহশালার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে চরের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে।
নিজেদের টিউশনের টাকা আর সীমিত সামর্থ্য দিয়েই স্বপন ও তার সহযাত্রীরা এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন। মাসুদ শাকিল, রাজিব, জিনিয়া জিম, নিম্নি ইসলামসহ অনেকেই এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই জাদুঘর এরই মধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বেশ আলোচনা এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্বপন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। ২০২৩-এ বেস্ট ডিপ্লোম্যাট মনোনয়ন পেয়েছিলেন, ২০২৪-এর গ্লোবাল ডায়ালগ ফর ক্লাইমেট জাস্টিস প্রজেক্টে আটটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইয়ুথ ফর এনডিসি (ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন) ইপ্লিমেন্টেশন ফেলোশিপ ২০২৬ মনোনীত হয়েছেন, যা তার চিন্তাশক্তি ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি বহন করে।
বর্তমানে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে পুরকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন স্বপন। প্রকৌশলবিদ্যার কঠিন পাঠের মধ্যেও তার মন পড়ে থাকে কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে। তিনি বিশ্বাস করেন, চরের উন্নয়নে শুধু ত্রাণ বা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং কার্যকর নীতিমালা।
চরের নারীদের ক্ষমতায়ন এবং শিশু অধিকার নিয়েও কাজ করছেন তিনি। তার সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারেন। একই সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্যও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্বপনের স্বপ্ন, চর জাদুঘরকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া, যাতে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়।







