ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনা

প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে সরকার ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে আগামী পাঁচ বছরে বাজারকে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, এবারের মহাপরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) নজরদারি, ডিজিটাল আইপিও, অনলাইন তথ্যপ্রকাশ, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনলাইন অনবোর্ডিং এবং স্বয়ংক্রিয় বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাসহ একাধিক উদ্যোগের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজার সংস্কার ও তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট গঠন, করপোরেট বন্ড ও সুকুক বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন বিধিবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে পরিকল্পনায়।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘শেয়ারবাজারের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে।’
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনায় শেয়ারবাজারকে শুধু লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়নে একটা রোডম্যাপ দরকার। তবে এটা শুধু মার্কেট রিকোভারির জন্য না করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য করতে হবে।’
এআইভিত্তিক নজরদারি: শেয়ারবাজারে কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও অস্বাভাবিক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করতে বিএসইসিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিএসইসিকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।
কারসাজি রোধ: বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এআইভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে।
সংস্কার ও তদন্ত কমিশনের সুপারিশ: পুঁজিবাজার সংস্কারের জন্য পৃথক সংস্কার কমিশন এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন করা হবে। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুশাসন, জবাবদিহি ও বাজারে আস্থা বৃদ্ধি করা হবে।
শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট: বন্ড ও ইক্যুইটি বাজার সম্প্রসারণে আইন আধুনিকায়ন, সরকারি সিকিউরিটিজের লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জে সম্পন্ন করা, অনলাইন তথ্যপ্রকাশ প্ল্যাটফর্ম চালু এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সুকুক, ইটিএফ ও গ্রিন বন্ড: করপোরেট বন্ড বাজারের পাশাপাশি ইটিএফ, সুকুক ও গ্রিন বন্ড সম্প্রসারণ করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার ‘গ্রিন বাংলাদেশ বন্ড’ ইস্যুর লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে এসএমই বোর্ড শক্তিশালী করা এবং তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হবে।
ব্লকচেইন ও বিদেশি বিনিয়োগ: শেয়ারবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এফপিআই অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু করা হবে। পাশাপাশি বিও হিসাব খোলা, কাস্টডিয়াল সেবা ও মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা হবে।
বিনিয়োগের সহজ প্রবেশাধিকার: স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ৩০ দিনের মধ্যে তালিকাভুক্তির সুবিধাসহ ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালু করা হবে। ই-কেওয়াইসি, মোবাইল ট্রেডিং এবং ব্যাংক ও এমএফএসভিত্তিক লেনদেন সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের বাজারে অংশগ্রহণ সহজ করা হবে।
ট্রাইব্যুনাল ও অভিযোগ নিষ্পত্তি: বিনিয়োগকারীদের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে শেয়ারবাজার ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলার সুযোগ চালু করা হবে। পাশাপাশি হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, আধুনিক অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং নতুন সিকিউরিটিজ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘শেয়ারবাজারের উন্নয়নে সরকারের রোডম্যাপ বাস্তবায়নে বিএসইসি পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।’




