কুষ্টিয়ার তিলের খাজা
জিআই সনদ আছে নেই বাঁচার নিশ্চয়তা

কারখানায় তিলের খাজা তৈরি ও প্যাকেট করতে ব্যস্ত কারিগররা -আগামীর সময়
‘এই খাজা... তিলের খাজা! কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজা!’— রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল কিংবা লঞ্চঘাট— এই চিরচেনা হাঁকডাক শুনলেই মনে পড়ে কুষ্টিয়ার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নের কথা। জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া, মণ্ডলপাড়া ও জয়নাবাদ এলাকার কুটিরশিল্পে তৈরি এই তিলের খাজা শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, এটি এ অঞ্চলের জীবন্ত ইতিহাস। পণ্যটি এখন যেমন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তেমনি কিছু সংকটে এর অস্তিত্বও চ্যালেঞ্জের মুখে।
কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে তিলের খাজা ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের একটি বড় স্তম্ভ। অধিকাংশ কারখানা অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যেখানে শ্রমিকরাই ব্যবসার মালিক। যেমন— ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ভাই ভাই স্পেশাল তিলের খাজা’র প্রতিষ্ঠাতা দুলাল হোসেন জানালেন, তাদের ২২ জন কর্মী মালিকের মতোই সমানভাবে ভাগ করে নেন লাভ-লোকসান।
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকলেও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি বর্তমানে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। কাঁচামাল যেমন— তিল, চিনি ও জ্বালানি কাঠের দাম বাড়লেও খাজার দাম সেভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি; ফলে কারিগরদের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জনে বেগ পেতে হচ্ছে। পাশাপাশি, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত মূল মৌসুম হওয়ায় বছরের বাকি সময় (অফ-সিজন) কারখানার উৎপাদন ও বিক্রি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়।
বর্তমানে বিএসটিআইয়ের তালিকাভুক্ত পণ্যের মধ্যে তিলের খাজার নাম না থাকায় গুণগত মান নিয়ে অফিসিয়াল মনিটরিংয়ের সুযোগও থাকছে সীমিত। এ ব্যাপারে বিএসটিআই কুষ্টিয়ার উপপরিচালক প্রদীপ কুমার মালো জানালেন, বিএসটিআই তালিকাভুক্ত ৪১৯টি পণ্যের মধ্যে তিলের খাজা না থাকায় করা হয় না অফিসিয়াল মনিটরিং। তবে যেহেতু কুষ্টিয়ার তিলের খাজা সারা দেশে বেশ জনপ্রিয় ও জিআই সনদপ্রাপ্ত, তাই পণ্যের মান ও তৈরির পরিবেশ ভালো রাখার জন্য আনঅফিসিয়াল পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
‘ভাই ভাই স্পেশাল তিলের খাজা’ কারখানার কারিগর আব্দুল কুদ্দুস বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকে এখানে কাজ শিখছি। এখন কারিগর হওয়ার পাশাপাশি আমি এই ব্যবসার অংশীদার। সপ্তাহে ৩ হাজার টাকা পাই, তাতে মোটামুটি ভালোই চলছে দিনকাল।’
কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর এলাকার হকার আব্দুল সাত্তার প্রতিদিন সকালে কারখানা থেকে বাকি হিসাবে তিলের খাজা সংগ্রহ করেন। সারা দিন শহর জুড়ে হেঁটে সন্ধ্যায় পাওনা মিটিয়ে দেন। তার ভাষ্য, ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার তিলের খাজা নিয়ে বিক্রি করে খরচ ছাড়া ৫০০-৬০০ টাকা (কখনো ৮০০ টাকা পর্যন্ত) হয়। এই আয়েই চলে তার চার সদস্যের পরিবার।
কুষ্টিয়ার তিলের খাজা শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। চিনি ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বিএসটিআইয়ের আওতায় এনে এর মান নিশ্চিত করতে পারলে এই ক্ষুদ্র শিল্পটি জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সার্বিক বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান। তিনি বলেছেন, তিলের খাজার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ভোক্তা অধিদপ্তর মনিটরিং করতে পারে। আমরা এ ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের সঙ্গে কথা বলব। তিলের খাজা শিল্পকে কীভাবে কারিগরি সহায়তা করা যায়, এ বিষয়টি দেখব। যদি কেউ তিলের খাজা নিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করব।






