গবেষণা
প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই ৬০ শতাংশ মানুষের
- ফায়ার সার্ভিসের জরুরি সেবা ‘১০২’ সম্পর্কে জানে না অনেকে

ছবি: আগামীর সময়
বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রস্তুতি এবং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। সম্প্রতি এক গবেষণায় পাওয়া গেছে এ তথ্য। বিশেষ করে গণদগ্ধ ও বহুমাত্রিক আঘাতজনিত জরুরি পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় রয়েছে মারাত্মক ঘাটতি।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে খুলনার সিএমএন অ্যান্ড বসু হেলথ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত গবেষণায় এই উদ্বেগজনক চিত্র ধরা পড়েছে। আজ রবিবার খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সিএমএন অ্যান্ড বসু হেলথ রিসার্চ সেন্টারের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও প্রোগ্রাম হেড অধ্যাপক ডা. বঙ্গ কমল বসু। তিনি জানান, ঢাকা ও খুলনা সিটি করপোরেশনসহ মোংলা, সাভার এবং আশুলিয়ার মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল থেকে এই গবেষণার উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।
গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ জীবনে কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক চিকিৎসা বা ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ নেয়নি। এ ছাড়া ৬২ শতাংশের বেশি মানুষ দগ্ধ রোগী পরিবহনের সময় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে একেবারেই অবগত নন।
অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, মানুষের মাঝে এখনো পুড়ে যাওয়া স্থানে টুথপেস্ট, তেল বা বরফ লাগানোর মতো ক্ষতিকর প্রথাগত অপচিকিৎসার ধারণা রয়ে গেছে। একই সঙ্গে শ্বাসনালি দগ্ধতা প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক করণীয় জানে না বেশিরভাগই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গাইডলাইন অনুযায়ী রোগী ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অধিকাংশ উত্তরদাতার ধারণা সীমিত, যা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ডা. বঙ্গ কমল বসু বলেছেন, কাগজে-কলমে প্রস্তুতি থাকলেও সাধারণ মানুষের কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি সরকারি উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও প্রচারের অভাবে ফায়ার সার্ভিসের জরুরি হটলাইন নম্বর ‘১০২’ সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের ধারণা প্রায় শূন্যের কোটায়।
গবেষণার প্রিন্সিপাল কম্পোনেন্ট অ্যানালাইসিস দেখাচ্ছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কমিউনিটি পর্যায়ের সামাজিক সক্ষমতার অভাব, যা সামগ্রিক সমস্যার সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ২ শতাংশ গুরুত্ব বহন করে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালের ১১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে সক্ষম। এটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিশেষায়িত বার্ন ও ট্রমা সেবার তীব্র সংকটকে নির্দেশ করে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং তথ্য আদান-প্রদানে বিলম্বের কারণে রোগী স্থানান্তর ও দ্রুত চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষকরা কমপ্রিহেনসিভ বার্ন-পলিট্রমা ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড এমারজেন্সি রেসপন্স (সিবিপিডিপিইআর) মডেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে জোর সুপারিশ করেন।
সুপারিশমালার মধ্যে রয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পাঞ্চল ও হাসপাতালের সক্ষমতা চিহ্নিত করে মানচিত্র তৈরি করা, সড়কে ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য গ্রিন করিডর করা এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করা।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পর্যায়ে অংশীজনদের নিয়ে সিবিপিডিপিইআর সমন্বয় কমিটি গঠন, হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা ইমার্জেন্সি রেসপন্স ইউনিট শক্তিশালী করা, স্ট্যান্ডার্ড ট্রায়াজ সিস্টেম চালুকরণ এবং স্কুল, কলেজ ও শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ ও অগ্নি মহড়া বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে দেশে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. বঙ্গ কমল বসু মন্তব্য করেন, এই সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে জাতীয় নীতিনির্ধারণে পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।






