বাউফল
বাবা-মায়ের কবর ঘিরেই ২১ একরের সবুজ স্বপ্ন মিলটনের

নূরজাহান গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা মো. শাহবাজ হোসেন খান মিলটন। ছবি: আগামীর সময়
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন শাহবাজ হোসেন খান মিলটন। সেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম ট্যাক্সি চালাতেন তিনি। একদিন তিনি এক যাত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন একটি সুসজ্জিত ছোট বাগানে। সেই বাগানই বদলে দেয় তার চিন্তার জগৎ।
মনে জন্ম নেয় নিজের গ্রামের মাটিতে এমন কিছু গড়ে তোলার স্বপ্ন। বহু বছর পর সেই স্বপ্নই বাস্তব রূপ নিয়েছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের শৌলা গ্রামে। সেখানে ২১ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে প্রকৃতি, কৃষি ও বিনোদনের সমন্বয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘নূরজাহান গার্ডেন’।
নূরজাহান গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা মো. শাহবাজ হোসেন খান মিলটনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকার একটি ছোট বাগান আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তখনই ভাবি, দেশে ফিরে এমন একটি বাগান গড়ে তুলব; যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি কৃষি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জন্য কিছু করার সুযোগ থাকবে।’
তবে শুধু একটি সুন্দর বাগান গড়ে তোলাই ছিল না তার লক্ষ্য। এর পেছনে ছিল পারিবারিক ও সামাজিক একটি বড় ভাবনা।
তিনি বলেছেন, ‘আমার বাবা-মায়ের কবর এখানে। আমি চেয়েছি আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন এই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না হারায়। তারা যেন নিয়মিত এখানে আসে, বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করে এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। সেই চিন্তা থেকেই এই বাগানের যাত্রা।’
২০০৫ সালে একটি পুকুরের চারপাশে পেঁপে, লেবু ও বিভিন্ন শাকসবজির চাষের মাধ্যমে শুরু হয় তার উদ্যোগ। ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগের পরিধি বাড়তে থাকে। যুক্ত হয় বিভিন্ন ফলের গাছ, মাছ চাষ, নার্সারি এবং বিনোদনের নানা আয়োজন।
বর্তমানে বাগানটিতে রয়েছে প্রায় ৫০ জাতের আমগাছ। এ ছাড়া রয়েছে অসংখ্য ফলজ ও বনজ বৃক্ষ, ২৪টি ছোট-বড় পুকুর, মাছের পোনা উৎপাদনকেন্দ্র, হরিণ, পাখি এবং কৃষিভিত্তিক নানা প্রকল্প। প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের জন্য এটি এখন এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
শাহবাজ হোসেন বলেছেন, ‘আমি সব সময় চেয়েছি এলাকার মানুষকে বিষমুক্ত ফল, শাকসবজি ও মাছ খাওয়াতে। মানুষ যেন নিরাপদ খাদ্য পায়, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। শুধু উৎপাদন নয়, সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছি।’
তার এই উদ্যোগ এখন স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাগানটিতে বর্তমানে ১৩ জন স্থায়ী কর্মচারী কাজ করছেন। এ ছাড়া দৈনিক ভিত্তিতে বহু শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। দর্শনার্থীদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দোকান, পরিবহন ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসাও বিকশিত হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আজ এখানে অনেক মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটিই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।’
প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় নূরজাহান গার্ডেনে। বাগানে থাকা পাখিদের ফল খেতে বাধা দেওয়া হয় না। এমনকি পাখি খাওয়া ফল কিংবা গাছ থেকে ঝরে পড়া ফল বিক্রির ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
শাহবাজ হোসেনের ভাষ্য, প্রকৃতিরও অধিকার আছে। পাখিরা ফল খেলে তাদের তাড়ানো যাবে না। আমরা চাই মানুষ ও প্রকৃতি একসঙ্গে বেঁচে থাকুক।
বর্তমানে বাগানটিতে বিভিন্ন জাতের কলা, খেজুর, সুপারি, তরমুজ, মিষ্টিকুমড়া, লাউসহ নানা মৌসুমি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। রয়েছে আটটি হরিণ, যাদের খাদ্যের জন্য আলাদাভাবে শাকসবজি ও ফলের চাষ করা হয়। কৃষির পাশাপাশি প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিজের সফলতার পেছনে পরিবারের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছেন, ‘আমার বড় ভাই শাহাদাৎ হোসেন খান, ভাবি, স্ত্রী, এলাকাবাসী, সাংবাদিক ও প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এত দূর আসা সম্ভব হতো না। তাদের উৎসাহই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, খেজুর গাছ রোপণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে খেজুরের রস উৎপাদন বাড়াতে চান। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক পর্যটনের আরও নতুন উদ্যোগ যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গাছ লাগানোর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘মাটি কখনো ঘুষ চায় না। আপনি একটি চারা রোপণ করুন, কিছুদিন পর মাটি আপনাকে তার প্রতিদান দেবে। তাই যার যতটুকু জায়গা আছে, অন্তত একটি হলেও গাছ লাগানো উচিত।’
প্রকৃতি, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য সমন্বয় হয়ে উঠেছে নূরজাহান গার্ডেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বাগান এখন শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং গ্রামীণ উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা চিন্তার একটি সফল উদাহরণ।







